ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ভীতিকর রাষ্ট্র কায়েমের পথে কী বিএনপি সরকার?

এমডি কাওসার আহমেদ

প্রকাশ: ২১:১৪, ২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৮, ২ অক্টোবর ২০২৬

ভীতিকর রাষ্ট্র কায়েমের পথে কী বিএনপি সরকার?

ছবিটি এই সৃষ্ট।

দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের হাতে চরম নির্যাতন, খুন, গুম, রাহাজানি, লুটপাট, মহা-দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, গণতন্ত্রের মৃত্যুশয্যা পরিস্থিতি পার করেছে দেশবাসী। চরম ভীতিকর একটি দেশে খোদার অসীম মহিমায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত দাবানল শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনকে ধূলিসা’ করলে মুক্তির স্বাদ পায় মানুষ। আবার গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল। তবে, ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হলেও ফের নতুন যাঁতাকল কী নির্মাণ করছে বর্তমান বিএনপি সরকার। যে ভয়ানক শাসনের ভুক্তভোগী বিএনপি সেই দলটি কী আবারও ভীতিকর রাষ্ট্র কায়েমের পথে হাঁটছে?

সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদির; বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেতা, উদ্যোক্তা ও ইনফ্লুয়েঞ্চার। ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাডবয় হিসেবে পরিচিত সালমান মুক্তাদির সোশ্যাল মিডিয়া জগতে অনেক বড় আইকনিক। তার ফলোয়ার অসংখ্য। তার প্রভাবও অনেক বেশি। ফ্যাসিবাদের পতনের সময় ২০২৪ সালে তার ভূমিকা আজও স্মরণীয়। অভ্যুত্থানের সময় যখন কনটেন্ট ক্রিয়েটর জগতের সবাই আত্মগোপন ও তোষামোদিতে ব্যস্ত তখনই বুক টান করে শেখ হাসিনা রেজিমের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন সালমান। তারপর থেকে তার জনপ্রিয়তাও আকাশচুম্বী হয়। সেই লোকের প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ পাওয়া গেল। হামলার বিষয়ে সালমান মুক্তাদির সরাসরি বিএনপির নেতাকর্মীদের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। এ ঘটনার আইনি প্রতিকার না পেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিনসহ দায়িত্ববানদের তুলোধোনো করেছেন সালমান। একের পর এক যুক্ত উপস্থাপন করে বিএনপির সরকার ও তার মন্ত্রীসভাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছেন তিনি। 

তার এসব কাণ্ডে বেজায় চটেছে বিএনপির নেতাকর্মী, বিএনপিপন্থী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যা করতে পারেনি, তা করে দেখিয়েছে বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের স্টাবলিশমেন্ট। সালমান মুক্তাদির তাদের এ কর্মকাণ্ডকে দেশের কোনো ভালো কিছুতে করলে উপকার হবে বলে টিটকারী মেরেছেন। নেতাকর্মী, সাংবাদিক সমাজ যখন অনবরত সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ে উন্মাদ তখন স্বয়ং বিএনপি সরকার রাষ্ট্রের শক্তি নিয়ে সালমান মুক্তাদিরের পেছনে লেগে গেছে। রাষ্ট্রের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাকে লেলিয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা তার ব্যাংকের সকল হিসাব-নিকাশ করতে নেমে পড়েছে। বিএনপিকে চাঁদাবাজ বলায় সালমানকে হয়রানির জন্য এসব করা হচ্ছে বলে খোদ ব্যাডবয় অভিযোগ করেছেন। 

সালমান মুক্তাদিরের ভাষ্য, আমার মতো একজন ব্যক্তি যদি বিএনপি ও তার সরকারের রোষানলে পড়ে যে পরিমাণ হয়রানির শিকার হচ্ছি, তা সাধারণ মানুষের সঙ্গে হলে কী হতে পারে বুঝে নিন।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা ও নিউজ এজ প্রকাশিত চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে ৮৩ শতাংশ বিএনপির নেতাকর্মী জড়িত বলে তারা তদন্তে জানতে পেরেছে। তবে, বিএনপিকে চাঁদাবাজ বলাটা সালমান মুক্তাদিরের ভুল হয়েছে, কারণ তার কাছে কোনো পরিসংখ্যান ছিল না।

শুধু সালমান মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত সম্পদ শুধু নয়, তার শশুরের সম্পদেও নজর দিয়েছে সরকার। সালমান মুক্তাদিরকে চাপে ফেলতে ও নতজানু করতে তার শশুরের শুল্কমুক্ত মদের বেশ কয়েকটি গোডাউন সিলগালা করে দিয়েছে সরকার। যাতে, শশুরের মাধ্যমে হলেও সালমান মুক্তাদিরকে নতজানু করাতে হবে। কিন্তু তরুণ সমাজের আইকন, ঘাউড়া সালমানকে কতটুকু সোজা করতে পারবে তা সময়ের অপেক্ষামাত্র। 

অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান; বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক সমালোচক, সামরিক বিশ্লেষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা। সামরিক জীবন শেষে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হন। নানা কর্মকাণ্ডের জন্য বিএনপি থেকে পাঁচবার বহিষ্কৃত হন। আবার তাকে দলে  ভেড়ানো হয়। অবশেষে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান জামায়েত ইসলামীর নৌকায় পা রাখেন। আখতারুজ্জামান স্পষ্টভাষী ও অনেকটা ধাম্বিক প্রকৃতির লোক। তিনি বিএনপি করাকালীন অনেক নেতিবাচক কাজ করে সমালোচনায় পড়েন। তবুও ফ্যাসিবাদী সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাগেজ ও জমজমের পানি খোয়ানো সংক্রান্ত বিষয়ে সেখানকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ওমরাহ হজ থেকে ফেরা মানুষদের ভোগান্তি ও ৩৬ জন এমপি একই ভোগান্তিতে পড়েন। সেটাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত হন আখতারুজ্জামান। জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের  শাসানোয় মামলার আসামি হয়েছেন তিনি। সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। 

এদিকে, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করা একটি ভিডিওতে লাইক দেওয়ার অভিযোগে এক স্কুলশিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মিঠাখালী পিজিএস আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল আমিন কামাল স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বরখাস্ত হওয়া শিক্ষক মো. মামুন অর রশিদ তালুকদার ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (গণিত)। তার ইনডেক্স নম্বর ঘ১১১৮০২৮।

গত ৯ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ‘ভোলা মিশন’ নামে একটি পেজে ‘সন্ত্রাসীদের বাপের নাম তারেক রহমান’ ও ‘খেলা জমে গেছে’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ওই ভিডিওতে মামুন অর রশিদ তালুকদার লাইক দেন। পরে এ ঘটনায় তাকে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ২১ সেপ্টেম্বর স্মারক নম্বর ৩৬/২৬-এর অফিস আদেশে তদন্ত ও অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। আদেশে বলা হয়েছে, বরখাস্তকালীন সময়ে তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।

তবে, অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষক মামুন অর রশিদ তালুকদার বলেন, ৯ আগস্ট রাতে ফেসবুক নিউজফিডে স্ক্রল করার সময় অসাবধানতাবশত তার আঙুলের ডাবল ট্যাপে ভিডিওটিতে লাইক পড়ে যায়। পরে ভিডিওটি আপত্তিকর বুঝতে পেরে তিনি লাইক প্রত্যাহার করেন।

এই কয়েকদিনের তিনটি ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, যত বড় প্রভাবশালী হও, যত পুরোনো রাজনীতিবিদ হও, মুক্তিযোদ্ধা হও; সরকার তার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে দমাতে প্রস্তুত। সালমান মুক্তাদির বা মেজর অবসরপ্রাপ্ত আখতাজরুজ্জামানের মতো বড় ফিগারের লোকদের সরকার যদি হেনস্তা করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হলেও চুপ করে ভীতিকর রাষ্ট্রে মুখ বুঝে সব সহ্য করেই যাবে। শেখ হাসিনা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিএনপি বা ভিন্নমতাবলম্বীদের শায়েস্তা করতেন নির্দয়ভাবে। কাউকে শায়েস্তার জন্য আদালত, দুদক, পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাকেও ব্যবহার করতে ছাড়তেন না। তবুও তার শেষ রক্ষা হয়নি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিংস্রতার ইতিহাস পুরনো। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালও ছিল হিংস্রতায় ভরা। রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন ও লুটপাটে দিশেহারা হন দেশবাসী। ঘটনাক্রমে শেখ মুজিবুর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতির পট পরিবর্তন করেছিল। কিন্তু সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।  সাবেক সেনাশাসক থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ছাত্রদল আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ নেতৃত্বাধীন বাকশালের রক্ষীবাহিনীর মতো রূপ ধারণ করে। তারপরই আবার স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে শ্রমিক নেতাদের জ্বালা। আবার বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের হিংস্রতার রাজনীতি দেশের মানুষের ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়। তবে ২৪শের গণঅভ্যুত্থানে ভয়মুক্ত শান্তির একটি দেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল মানুষ। তবে, বিএনপির অতীত নীতি আবার ফিরিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলে আবার ভীতিকর রাষ্ট্রের পথে চলে যাবে বাংলাদেশ।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক

ইমেইল: kawsar94ahmed@gmail.com

সম্পর্কিত বিষয়:

আরও পড়ুন