ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

কালের কণ্ঠের অপসাংবাদিকতার বিশ্লেষণ পর্ব (২)

এইচভি প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৫৫, ২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০০:২২, ৩ জুলাই ২০২৬

কালের কণ্ঠের অপসাংবাদিকতার বিশ্লেষণ পর্ব (২)

হাসনাত আব্দুল্লাহ-ছবি: এআই

বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের দৈনিক কালের কণ্ঠের বেশ কিছু প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফ্রেমিং সাংবাদিকতার অভিযোগ উঠেছে। সেসব প্রতিবেদনের মধ্যে আজ ‘‘যুক্তরাজ্যে আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন হাসনাত আবদুল্লাহ!‘‘ শিরোনামের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদভিত্তিক বিশ্লেষণ করবে হিউম্যান ভয়েস ডট নিউজ।

প্রথমত, যুক্তরাজ্য থেকে নুরুল হক শিপু নামের একজন প্রতিনিধি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন কালের কণ্ঠে। কালের কণ্ঠের সম্পাদনা বিভাগ প্রতিনিধির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কোনো শিরোনাম করেনি। কারণ, প্রতিবেদনের ভেতরে কোথাও প্রতিনিধি লেখেননি `হাসনাত আব্দুল্লাহ আইনি জামেলায় পড়তে পারেন বা কারো এ রকম বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনে। শিরোনামটি করা হয়েছে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ -১

যুক্তরাজ্যে এক যুবকের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী জুবায়ের আহমদ। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবে কর্মরত বলে জানান।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-১ 

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজে একটি সংঘাতের খবর প্রকাশ হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে। যিনি আহত হওয়ার দাবি করেছেন তিনি বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সিলেট ইউনিটের একজন সাবেক নেতা। তিনি এখনো ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-কমিটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে পদাধিকার রয়েছে বলে দাবি করেন। জুবায়ের আহমদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছে হিউম্যান ভয়েস। মিশ্র রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা জুবায়ের তারও আগে হাসনাতের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের বিক্ষোভের সময় তার সরব উপস্থিতির ভিডিও দেখেছে হিউম্যান ভয়েস টিম। যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও আইনি বিষয়ে স্থানীয় সূত্র ব্যবহারও করেছে কালের কণ্ঠ। আর আহত দাবিদার যুবকের পরিচয় ছাত্রলীগ লুকিয়ে ল্যাবে কর্মরত হিসেবে উপস্থাপন করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-২

বাইকে থাকা অবস্থায় ধাওয়া ও হামলার অভিযোগ: জুবায়ের আহমদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিকেল ৪টার দিকে কাজ শেষে মোটরসাইকেলে ফেরার পথে একটি মাইক্রো বাইকের কাছাকাছি এসে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে তিনি গাড়ির পিছু নিয়ে একটি গ্রামীণ সড়কের দিকে গেলে ভ্যানটি সেখানে থামে।এরপর গাড়ি থেকে প্রায় ৮ জন ব্যক্তি নেমে এসে তাকে আক্রমণ করে বলে তিনি দাবি করেন। এসময় একজন ছোট একটি ছুরি দিয়ে আঘাত করলে তার পেটে জখম হয় বলে তিনি নিজেই কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণের অনুচ্ছেদ-২

জুবায়ের আহমেদের অভিযোগের বরাতে কালের কণ্ঠ যে তথ্য দিয়েছে তার অর্থ দাঁড়ায় যে, ছাত্রলীগের নেতাকে হাসনাতদের গাড়ির সবাই জানতো। তারা ছাত্রলীগ নেতাকে চলন্ত অবস্থায় চিহ্নিত করে তাকে ধাক্কা মারতে চেয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গ্রামীণ সড়কের দিকে ভ্যান যায় এবং পিছু নেন যুবক জুবায়ের। অর্থ্যা’ আইনি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সরাসরি  হাসনাতদের ধাওয়া করতে গিয়েছিলেন জুবায়ের। কালের কণ্ঠকে বললেও তার ক্রস চেক করেনি গণমাধ্যমটি। লন্ডনভিত্তিক বাংলা অনলাইন চ্যানেল রানার নিউজকে দেওয়া সাক্ষা’কারে জুবায়ের বলেছেন তিনি জানতেন না হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই গাড়িতে ছিলেন। অথচ, কেউ ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাজ্যে কেউ কোনো অভিযোগ করে না, আর অভিযোগ করলে অনলাইনে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা সম্ভব। তিনি আইনি পথে না গিয়ে হাসনাতদের ধাওয়া দেওয়ার কারণ ছিল তিনি ছাত্রলীগের নেতা।  এতে প্রতিবেদনের আসল রহস্য পরিষ্কার হয় যে, জুবায়েরকে ভুক্তভোগী বানাতে কাজ করেছে কালের কণ্ঠ।  

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৩

ভুক্তভোগীর দাবি, হামলার সময় তার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হচ্ছিল, এটি বুঝতে পেরে হামলাকারীরা ফোনটি নিয়ে নেয়। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক ব্রিটিশ নারী ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করেন এবং আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই নারী পুলিশের কাছে তার হয়ে সাক্ষীও দিয়েছেন।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৩
 
ভুক্তভোগীর বরাতে কালের কণ্ঠ বলছে, কেউ ভিডিও ধারণ করছিল বা ভুক্তভোগী নিজেই ভিডিও ধারণ করছিল। অর্থ্যা’, জুবায়ের জানতেন, ঐ ভ্যানে  হাসনাত আছেন এবং তাকে হেনস্তা করে ভিডিও করবেন। তবে , সেটার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি কালের কণ্ঠ। 

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৪

পুলিশের তদন্ত ও একজনের জিজ্ঞাসাবাদ: ঘটনার পর ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এ ঘটনায় এনসিপি নেতা জাকিরকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ-৪

কালের কণ্ঠ জাকিরকে হেফাজতে নেওয়ার খবরটি সঠিক সূত্র থেকে জানতে পারেনি বা সূত্রের বরাত দেয়নি। এছাড়া, অভিযোগ গঠনের বিষয়টি পুলিশ বা ভুক্তভোগীর আইনজীবীর কাছ থেকে জানা যেত। সেটারও কোনো বক্তব্য নিতে পারেনি কালের কণ্ঠ। 

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৪

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা অভিযোগ: এদিকে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব মো. এম এ হিমেল এক বিবৃতিতে অভিযোগগুলোকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন।তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে হয়রানি ও অপপ্রচারের চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের মাধ্যমে পুলিশি প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি তার।অন্যদিকে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে, এটি একটি গুরুতর হামলার ঘটনা এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৪

অনুচ্ছেদ -৪-এ এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের  বিবৃতির অনেকটা অংশ উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ভুক্তভোগীর বক্তব্য কম শব্দে সমাপ্ত করা হয়েছে। 

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৫ 

তদন্ত চলমান:স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুরো ঘটনাটি নিয়ে পুলিশি তদন্ত চলমান। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ-৫

যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সূত্র বলতে কিছু নেই। কারণ, স্থানীয়রা আইনি বিষয়ে সরাসরি নাক গলাতে পারেন না বা খবরও রাখে না। পুলিশি তদন্তের তথ্য শুধু পুলিশ ও আইনজীবী বা স্থানীয় গণমাধ্যম জানতে পারে। এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে নির্দিষ্ট কাউকে উল্লেখ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।  

নোট: সংবাদের শিরোনাম ও প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে কোনো মিল পায়নি হিউম্যান ভয়েস। আইনের কী কী ধারায় কী সমস্যায় হাসনাত আব্দুল্লাহ পড়তে পারেন তার কোনো তথ্য দেখা যায়নি প্রতিবেদনে।

নির্দেশিকা: এই সংবাদ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে লাল রঙের লেখা কালের কণ্ঠ পত্রিকার হুবহু আর কালো রঙের লেখা হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনলাইন লিঙ্ক সংযুক্ত করা হলো- https://www.kalerkantho.com/online/nrb/2026/06/21/1700630

হিউম্যান ভয়েসের বক্তব্য: সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়, কাউকে নিরপরাধ বা অপরাধ বানানোর জন্য নয়। সত্য সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠাকেই দায়িত্ব মনে করে হিউম্যান ভয়েস।

আরও পড়ুন