ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

একই মামলায় ক্ষমতাসীন নেতারা খালাস, জোট সঙ্গীর সাবেক নেতার মৃত্যুদণ্ড

এইচভি প্রতিবেদক, সিলেট

প্রকাশ: ২১:৫৮, ২৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৫৮, ২৫ জুন ২০২৬

একই মামলায় ক্ষমতাসীন নেতারা খালাস, জোট সঙ্গীর সাবেক নেতার মৃত্যুদণ্ড

খালাসপ্রাপ্ত মি. বাবর, মি. চৌধুরী ও মি. গৌছ- ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যাচেষ্টা মামলায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ তিন নেতা খালাস পেয়েছেন। একই মামলায় ২০২৬ সালের নির্বাচনে জোট সঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ছাত্র সংগঠনের সাবেক এক নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত। এ মামলায় ক্ষমতাসীনদের তিন নেতা ছাড়াও আরো খালাস পেয়েছেন ছয়জন।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে এ রায় দেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার।

সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন বলেন, মামলার রায়ে আজিজ নাঈম নামের একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের খালাস দেওয়া হয়েছে।

খালাসপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীন দলের তিন নেতা হলেন- আরিফুল হক চৌধুরী, জিকে গৌছ ও লুৎফুজ্জামান বাবর। এর মধ্যে মি. চৌধুরী বর্তমান সরকারের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী, মি. গৌছ জাতীয় সংসদের হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর মি. বাবর বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম আজিজ নাঈম, যিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সাবেক নেতা।

খালাস পেয়ে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তাদের মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ''রাজনৈতিক হয়রানির জন্য গত ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের এ মামলায় আসামি করে। মামলার এজাহারে আমাদের নাম ছিল না। পরে সম্পূরক চার্জশিটে তাদের নাম ঢুকানো হয়। আজ রায়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।''

সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, ''সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষী না দেওয়ায় আমাকে একের পর এক মামলায় ফাঁসানো হয়। দীর্ঘদিন আমি কারাবন্দি ছিলাম।। আজকে যারা আমাকে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে তারা পালিয়েছে। আর আমরা খালাস পেয়েছি।''

হুইপ জিকে গৌছ বলেন, ''এই মামলায় মামলাকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি থাকতে হয়। আজকে রায়ের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো।''

এদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও তার পক্ষ। মৃত্যুদণ্ড আসামি আজিজ নাঈমের ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ জানান, তার ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে নাঈম জড়িত নয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

রায়ের পর যখন খালাসপ্রাপ্তরা ফুরফুরে মেজাবে আদালত থেকে বের হচ্ছিলেন তখন আদালত চত্বর থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসামি আজিজ নাঈম।

আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, মামলার অভিযোগপত্রের তথ্যানুযায়ী আসামির সংখ্যা ১০ জন। সেই আসামিদের মধ্যে জামিনে থাকা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও সরকারদলীয় হুইপ জি কে গৌছ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সকালে আদালতে হাজির হন। গণমাধ্যম বলছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আজিজ নাঈমও জামিনে ছিলেন।

তবে বাকি আসামিদের নাম সংবাদমাধ্যমগুলো এখনো উল্লেখ করেনি।

কে এই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আজিজ নাঈম?

মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আজিজ নাঈম সাবেক ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের একজন সাবেক নেতা। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর এলাকায়।  ঐ এলাকায় সাবেক ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের একজন পরিচিত নেতার বাড়ি, যার নাম শাহীনুর পাশা চৌধুরী। তারা একই সংসদীয় আসনের এলাকার মানুষ। যদিও ছাত্র জমিয়ত থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশে যোগ দেন মি. পাশা। তখন হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাবরণ করছিলেন আজিজ নাঈম। পরে শাহীনুর পাশা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে যোগ দেন।

সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর সিলেটে বোমা হামলা গ্রেফতার হয়েছিলেন আজিজ নাঈম। যদিও পরে এই মামলায় খালাস পান। এছাড়া সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা মামলা, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের উপর বোমা হামলা মামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এসএম কিবরিয়া হত্যা মামলারও আসামি আজিজ নাঈম। সুরঞ্জিত সেন হত্যা চেষ্টা মামলায় জেল খাটার পর সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পান। আজিজ নাঈমকে ‘জঙ্গি` হিসেবে বিভিন্ন মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও, ছাত্র জমিয়ত বা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যক্রমের কোনো অভিযোগ নেই।

মামলার তদন্ত অনুযায়ী বলা হচ্ছে, আসামি আজিজ নাঈম আদালতে ১৪৪ ধারায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যাচেষ্টার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তবে তার ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ দাবি করেন, তার ভাইকে জঙ্গি সাজাতে চেয়েছিল এক-এগারোর সরকার। তাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা চেষ্টা মামলায় নির্যাতন করে ১৪৪ ধারায় জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে।

মামলার মূল প্রেক্ষাপট

সুনামগঞ্জের দুর্গম এলাকা দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজন করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সেই সমাবেশটির তারিখ ছিল ২০০৪ সালের ২১ জুন । ঐ দিন যখন সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে তখন প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন মি. সেনগুপ্ত। ঐ সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে যুবলীগের এক কর্মী ঘটনাস্থলে নিহত ও ২৯ জন আহত হন। হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান মি. সেনগুপ্ত।

ওই ঘটনায় দিরাই থানার এসআই হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর মি. বাবর,  মি. চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু হয়।

এদিকে, আজিজ নাঈমকে কোরআনের হাফেজ উল্লেখ করে তার নাম সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফ বলা হচ্ছে সিলেটের সাধারণ জনগণ ও আলেম সমাজ নামের একটি প্লাটফর্ম থেকে। এরইমধ্যে প্ল্যাটফর্মটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও নিরপরাধ আলেমের দাবিতে শুক্রবার জুমার পর সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বা ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ থেকে তাদের সাবেক নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিষয়ে এখনো কোনো বিবৃতি সংবাদ মাধ্যমে পাঠায়নি।

নোট: প্রতিবেদনটির তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন