বাসস
প্রকাশ: ২৩:৩৫, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংগৃহীত
মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। রায় ঘোষণার সময় সাত আসামিই পলাতক ছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের ৫০ শতাংশ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের মধ্যে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ ছিল। এর অধিকাংশ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তারা এ রায়ে সন্তুষ্ট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। রায়ের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়ে তিনি বলেন, রায় অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের সম্পদ সরকার খুঁজে বের করবে। যে সম্পদ পাওয়া যাবে, তার অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে। তবে রায় ঘোষণার পর আপিলের জন্য ৩০ দিনের সময় রয়েছে। এ সময় শেষ হওয়ার পর রায় বাস্তবায়নে আইনগত বাধা থাকবে না বলে জানান তিনি।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
প্রথম সাক্ষী হিসেবে শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক সাক্ষ্য দেন। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
গত ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে সোমবার ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন।
আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান মামলা পরিচালনা করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, আইন অনুযায়ী তারা যুক্তি উপস্থাপন ও জেরা করেছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়। এসব ঘটনায় আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর আহত করা হয়। এসব অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর বিভিন্ন ধারায় সাত আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের ফোনে কথা হয়। সেখানে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
১৪ জুলাই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যকে সমর্থন এবং ১৫ জুলাই ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর মতো বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কাদেরের বিরুদ্ধে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ১৬ জুলাই তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশ দেন কাদের। একই দিন চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ মহানগরের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ১৭ ও ১৮ জুলাই দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই কারফিউ ও সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ‘শুট অ্যাট সাইট’ নীতির সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাদেরের যোগাযোগ ছিল। এসব নির্দেশনার পর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তিনি তদারক করতেন এবং তার নির্দেশে সেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ৪ আগস্ট ফার্মগেটে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া এবং আন্দোলন দমনের পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৩ ও ১৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আন্দোলনকারীদের নিয়ে বক্তব্য দেন। ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে মহড়া ও হামলার পরিকল্পনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ১৯ জুলাই মহাখালী ও গুলশান এলাকায় হামলা এবং আন্দোলন দমনের খবর প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সশস্ত্র অবস্থায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, তার নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলন চলাকালে হামলায় অংশ নেন।
১ আগস্ট আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে পরশের বিরুদ্ধে।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের বিরুদ্ধে ১২ জুলাই সিলেটে বক্তব্য দিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় তিনি অংশ নেন এবং ১৯ জুলাই মিরপুরে অস্ত্রধারী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মহড়া দেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, তার নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ কয়েকজন নিহত হন।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের হুমকি দেওয়া এবং ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় তিনি নেতৃত্ব দেন। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে তার বক্তব্যের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’-এর নামে আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।
১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরে মাঠে থেকে হামলা তদারকির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আন্দোলন দমনে দলীয় নির্দেশনা সারাদেশে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ইনানের ভূমিকা ছিল।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে।
এর আগে পৃথক দুই ট্রাইব্যুনাল এ ধরনের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছেন। এসব মামলায় মোট ৬১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজকের রায়টি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম রায়।
রায়ের পর মিরপুরে শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর হলে জুলাইয়ের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলার শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন বলেও জানান তিনি।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে শহীদদের পরিবার, অঙ্গহারা ও আহত জুলাই যোদ্ধা এবং গণতন্ত্রকামী মানুষ আসামিদের সাজা কার্যকর দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।