ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

কালের কণ্ঠের অপসাংবাদিকতার বিশ্লেষণ পর্ব (৪)

এইচভি প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫:০৩, ১৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৫:৩৪, ১৩ জুলাই ২০২৬

কালের কণ্ঠের অপসাংবাদিকতার বিশ্লেষণ পর্ব (৪)

ছবি-এআই

বাংলাদেশের বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দৈনিক কালের কণ্ঠের বিরুদ্ধে অপসাংবাদিকতার অভিযোগ উঠেছে। কালের কণ্ঠে প্রকাশ হওয়া অনেক প্রতিবেদন নিয়ে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদন করছে হিউম্যান ভয়েস। এসব প্রতিবেদনে সাংবাদিকতার কোনো নীতিমালা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় ‘‘হাসনাত আবদুল্লাহ : সাদা সাদা, কালা কালা’’ শিরোনামের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ ভিত্তিক বিশ্লেষণ হচ্ছে আজ।

শিরোনামে হাসনাত আব্দুল্লাহ নামের রাজনৈতিক ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে দুই রূপের ইঙ্গিত করতে চেয়েছে দৈনিক কালের কণ্ঠ। মূলত এ প্রতিবেদনটি তাদের গ্রুপের আরেকটি পত্রিকা দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সেই প্রতিবেদনই বিশ্লেষণ করা হবে। এতে দুটি পত্রিকার মূল লক্ষ্য উন্মোচিত হবে।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-১

হাসনাত আবদুল্লাহ, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য। ২০২৪ এর জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এ ছাত্র। কুমিল্লার এক নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়াশোনার খরচ মেটাতে প্রথমে টিউশনি পরে একটি অনলাইন কোচিং সেন্টার শুরু করেন, যার নাম স্কুল অব এক্সিলেন্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে থাকাকালে হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। এ সময় ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে তিনি বলেন, অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটাই তার রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। সুযোগসন্ধানী, যখন যেমন প্রয়োজন তেমনি আকার ধারণ করেন। নিজে ইউটিউবার এ জন্য ভিউ ভালো বোঝেন। মানুষকে চটজলদি আকর্ষণ করার জন্য যা প্রয়োজন তাই করেন।

অনুচ্ছেদ-১ এর বিশ্লেষণ 

প্রতিবেদনের শুরুতে হাসনাত আব্দুল্লাহকে গরিব হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গরিব ঘরের ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কোচিং বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা আয় করেছে বলে তাকে প্রশংসার ছলে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। এদিকে,  হাসনাত আব্দুল্লাহ বিজয় একাত্তর হলে থাকাকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতি করার কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি হিউম্যান ভয়েস। হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজেও কখনো স্বার্থের কারণে ছাত্রলীগ করেছেন বলে জানাননি বা এমন বক্তব্য কিংবা ভিডিও দেখা যায়নি। সারজিস আলমের মতো হাসনাত আব্দুল্লাহকে রাজনীতির ময়দানে দেখা যায়নি। হিউম্যান ভয়েস দেখেছে, হাসনাত আব্দুল্লাহ কোটা বিরোধী আন্দোলনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারের বিরুদ্ধে এককভাবে আন্দোলন করেছেন। এছাড়া, হাসিনার শাসনামলের সময় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে টিভিতে টকশোতে দেখা গেছে। 


দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ- ২ 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসনাত সবার নজর কাড়তে ১০ নম্বর জার্সি গায়ে দিয়ে রাস্তায় নামেন, যেন সবাই তাকে সহজেই চিনতে পারে। এভাবেই আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদান না রেখেই তিনি বনে যান বড় নেতা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একাধিক নেতার অভিযোগ, মাঠের আন্দোলনের চেয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয় এবং নেতাদের সঙ্গে দেনদরবারেই বেশি সময় কাটান হাসনাত। মাত্র দুই বছরের রাজনৈতিক জীবন স্ববিরোধিতায় ভরা। নিজের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেন অথচ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে পরিচিত হাসনাত। নিজে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেন, আবার সংবাদপত্রে তার সমালোচনা হলেই তাকে মবের ভয় দেখান। নিজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন অথচ এলাকায় তার বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির অন্তহীন অভিযোগ। হাসনাতের রাজনীতির প্রধান উৎস হলো মবসন্ত্রাস। প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়েই রাজনীতির মাঠ দখল করা তার প্রধান কৌশল। হাসনাতের মবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, আবার হাসনাতই নিজের স্বার্থে চট্টগ্রামে গিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ হলো বর্তমান সময়ে বিতর্কিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর চরিত্র। বাইরে সাদা, ভিতরে কালা। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।


অনুচ্ছেদ-২ এর বিশ্লেষণ 

হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। বাংলাদেশ গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে যে কয়জনকে নেয়া হয়েছিল তাদের অন্যতম হাসনাত আব্দুল্লাহ। আন্দোলনে তার অবদান বিশ্লেষণ নয়, তাকে মবস্টার বানাতে চেয়েছে কালের কণ্ঠ। হিউম্যান ভয়েসে প্রকাশিত কালের কণ্ঠের অপসাংবাদিকতার বিশ্লেষণ পর্ব (১,২,৩) বিশ্লেষণ করেছে যে, কীভাবে হাসনাত আব্দুল্লাহকে মবসন্ত্রাসের জনক বানানোর চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ ও বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকা কালের কণ্ঠ। হাসনাতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি মর্মে জেনেছে হিউম্যান ভয়েস। আওয়ামী লীগের গুজব সেল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কালের কণ্ঠ তা কোনো সূত্র ছাড়াই লিখে দিয়েছে তাদের প্রতিবেদনে। আর এসব তথ্য মূলত বাংলাদেশ প্রতিদিনের থেকে ধার করে প্রকাশ করেছে কালের কণ্ঠ। নিজেরা সাংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নীতিমালা ছাড়াই প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখছে হিউম্যান ভয়েস।


কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৩

২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফ্রান্সভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপি একটি সংবাদ প্রকাশ করে যাতে অভিযোগ করা হয় সময় টিভিতে কর্মরত পাঁচ গণমাধ্যমকর্মীর একসঙ্গে চাকরি যাওয়ার ঘটনায় হাসনাত আবদুল্লাহর সংশ্লিষ্টতা ছিল। সিটি গ্রুপের ও সময় টিভির পরিচালক মোহাম্মদ হাসান বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেন যে হাসনাত আবদুল্লাহসহ ১৫ জনের একটি দল তাদের অফিসে গিয়ে কয়েকজনকে চাকরি থেকে বাদ দিতে চাপ দিয়েছিল। তবে হাসনাত আবদুল্লাহ সিটি গ্রুপে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও চাপ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে হাসনাত বাহিনী সিটি গ্রুপকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিলে তারা এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করেনি।

অনুচ্ছেদ-৩ এর বিশ্লেষণ 

হাসিনার শাসনামলে সময় টিভির বড় অংশের মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বিশেষ করে, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের বড় অংশ ছিল সময় টিভিতে। সময় টিভির ঢাকা অফিসের সিংহভাগ সাংবাদিক ছিলেন আওয়ামীপন্থী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপতথ্য রটিয়েছিল সময় টিভি। সেই অপতথ্য ও আন্দোলনকারীদের হত্যাযোগ্য করার জন্য কাজ করা পাঁচজনকে বহিষ্কারের দাবি করেছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। পরিচালক কমিটি বা ব্যবস্থাপনা পরিষদ পরিবর্তন হলে আওয়ামী সম্পৃক্ততা থাকায় তাদের বহিষ্কার করা হয়। ‍সময় টিভি ছাড়াও কালের কণ্ঠসহ বসুন্ধরা গ্রুপের পত্রিকা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পক্ষে ছিল। এই পত্রিকাগুলোর সমালোচনা করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ- ৪

২০২৫ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনী সম্পর্কে সমাজে ঘৃণা ছড়ানোর অপচেষ্টা করেন। এটি একটি চরম অন্যায় এবং অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত হাসনাতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ পোস্ট ঘিরে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নেত্র নিউজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। যাতে বলা হয় ‘হাসনাতের বক্তব্য ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ব গল্পের সম্ভার’। এভাবেই গুজব আর অপতথ্য ছড়িয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেই চলেছেন হাসনাত। হাসনাতের বিরুদ্ধে কোনো গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশন করতেও ভয় পায়। কারণ, হাসনাতের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হলেই, ওই সংবাদপত্রকে আওয়ামী লীগের দোসর কিংবা ভারতের দালাল ট্যাগ লাগিয়ে মবের হুমকি দেওয়া হয়।

অনুচ্ছেদ -৪ বিশ্লেষণ 

শেখ হাসিনা ছাড়া ভদ্রলোকের দ্বারা পরিচালিত আওয়ামী লীগ ফেরাতে চেয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু সুবিধাভোগী উচ্চতর সেনা কর্মকর্তা। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন, প্রথমে হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগকে রান করাতে পারলে পরে হাসিনাকে ফেরত আনা যাবে। মুষ্টিমেয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তার সেই অপচেষ্টা ফাঁস করে দেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।  হাসনাত আব্দুল্লাহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যেসব মিডিয়া জনগণের বিরুদ্ধে ছিল তাদেরই ভারতের দালাল বলেন। এর মধ্যে কালের কণ্ঠও অন্যতম দালাল হিসেবে বিবেচনা করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, যা বিভিন্ন বক্তব্যে দেখেছে হিউম্যান ভয়েস সংবাদ বিশ্লেষণ টিম।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৫

গত বছরের এপ্রিলে ‘বিলাসী জীবনসহ নানা প্রশ্নের মুখে হাসনাত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এই শিরোনামের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রথম আলোকে ফেসবুকে প্রকাশ্যে হুমকি দেন হাসনাত। তিনি বলেন, দিল্লি থেকে লিখে দেওয়া নিউজ করে যদি ভেবে থাকেন হাসনাত আবদুল্লাহকে থামাতে পারবেন তাহলে আপনারা এখনো ভুলের জগতে আছেন। হাসনাতের হুমকিতে প্রথম আলো সংবাদটি মুছে ফেলে।

 অনুচ্ছেদ-৫ এর বিশ্লেষণ

দৈনিক কালের কণ্ঠসহ বসুন্ধরা গ্রুপের সব মিডিয়া দৈনিক প্রথম আলো ও দ্যা ডেইলি স্টারের অপসাংবাদিকতার বিষয়ে প্রতিবেদন করে থাকে। অথচ, প্রথম আলোর রেফারেন্স দিয়েছে কালের কণ্ঠ। অথচ, কালের কণ্ঠ নিজেও জানে প্রথম আলোর প্রকাশিত সংবাদটি ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৬

হাসনাত একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও এখন প্রচণ্ড আওয়ামী লীগ বিরোধী। তার আন্দোলনকে ব্যবহার করেই অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করলেও গোপনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা ওপেন সিক্রেট। নিজ নির্বাচনি এলাকায় বিএনপিকে ঠেকাতে ‘আওয়ামী দোসর’দের সঙ্গে সমঝোতা করেন হাসনাত। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ হাসনাতের ছত্রছায়ায় এখানে আওয়ামী লীগ এখন পুনর্বাসিত হচ্ছে। নিজের প্রয়োজনে যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাসনাত কোলাকুলি করতে পারেন তার বড় প্রমাণ গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের কাট্টলি এলাকায় মনজুর আলমের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ খবর পেয়ে মনজুর আলমের বাসার সামনে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু মানুষ জড়ো হয়। পরে মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত জনতা হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে ধরে নানা প্রশ্ন করে। তেমন কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, মনজুর আলম ‘আওয়ামী লীগের দোসর’; হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে জুলাই যোদ্ধা, যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন; তাহলে তিনি কেন মনজুর আলমের বাসায়, সেটিও জানতে চান তারা মি. আবদুল্লাহর কাছে। পরে হাসনাতের ঘনিষ্ঠরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

অনুচ্ছেদ-৬ বিশ্লেষণ 

মনজুর আলম দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন। চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার অন্যতম শিষ্য মনজুর আলম আওয়ামী লীগ করেছেন, বিএনপি করেছেন। তবে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সুপরিচিত রাজনীতিবিদ হিসেবে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়য়ে আলাপ করতে গিয়েছিল হাসনাত আব্দল্লাহ। সেটিকে আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে বৈঠক বলে গুজব ছড়িয়েছিল আওয়ামী লীগের গুজব সেল হিসেবে পরিচিত ‘এ টিম’। সেটিকে লুফে নিয়ে প্রতিবেদনে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে কালের কণ্ঠ। 

দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৭

হাসনাতকে সব সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখা যায়। গত বছরের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। গণমাধ্যম কর্মীদের হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা কিছু অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে এসেছি। আমাদের অভিযোগগুলো আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি।’অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ভেরি কনফিডেনশিয়াল’ (অতিগোপনীয়)। কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এমন প্রশ্নে সরাসরি জবাব না দিয়ে হাসনাত বলেন, ‘এটা ভেরি কনফিডেনশিয়াল। এখন কনফিডেনশিয়াল বিষয় বলে দিলে তো আর কনফিডেনশিয়াল থাকল না। তা ছাড়া অপরাধীরা তখন সতর্ক হয়ে যাবে।’ পরে জানা যায়, হাসনাতের দুদক যাওয়ার পিছনে ছিল বড় চাঁদাবাজির পরিকল্পনা। একটি বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা দিয়ে তাদের আলটিমেটাম দেওয়া হয়, এ সময়ের মধ্যে শিল্পগোষ্ঠী হাসনাতদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে বিদেশে চলে যায়। হাসনাতের অভিযোগের কি হলো? জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক দিন পরই তারা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন।

অনুচ্ছেদ-৭ এর বিশ্লেষণ

গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে জানা যায় দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহকে চাঁদাবাজের তকমা দিতে চেয়েছে কালের কণ্ঠ। যে শিল্পগোষ্ঠীর কথা কালের কণ্ঠ বা বাংলাদেশ প্রতিদিন বলছে সেটি কোনো গোষ্ঠী তা কোনো মাধ্যমে জানতে পারেনি হিউম্যান ভয়েস।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৮

হাসনাত সংসদ সদস্য হয়েছেন মাত্র তিন মাস। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে এলাকায়। দেবিদ্বার উপজেলার দক্ষিণ মুইঙ্গলার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দাপূর্ব পাড়া বাইতুল ফালা জামে মসজিদের ঈদগাহ পাকা করার একটি টেন্ডার আসে। যেখানে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এলাকায় একটি মসজিদের ঢালাই কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০ ফুট ইন্টু ৪০ ফুট পাকা কাজের একটি টেন্ডার ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা দিয়ে করা হয়েছে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রিরা অভিযোগ করে বলেন- এ কাজ সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকাতেই করা সম্ভব। প্রায় ৯ লাখ কোথায় গেল?- এ প্রশ্ন এলাকাবাসীর। তাদের মতে স্থানীয় এনসিপি নেতারা এ টাকা আত্মসাৎ করেছে। ২০২৪ সালে বন্যার ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ হিসাব দিতে পারেননি হাসনাত আবদুল্লাহ। এ সময় বন্যা দুর্গতদের সাহায্যের জন্য জনগণের কাছে টাকা নেওয়া হয়, কিন্তু সেই টাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি।

অনুচ্ছেদ-৮ এর বিশ্লেষণ

হাসনাত আব্দুল্লাহের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করেছে কালের কণ্ঠ। হিউম্যান ভয়েস দেখেছে, হাসনাতের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার পক্ষে কোনো সঠিক প্রমাণ নেই।  মসজিদের কাজের যে অভিযোগ করা হয়েছে তার কোনো ভিত্তি পায়নি হিউম্যান ভয়েস। এছাড়া, হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়েছে যা হিউম্যান ভয়েসের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আর কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বরাদ্দের কাজের দায় হাসনাত আব্দুল্লাহের ওপর পড়ে না।  এছাড়া, ২০২৪ সালের বন্যার টাকা প্রধান উপদেষ্টার ফান্ডে জমা দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে হিউম্যান ভয়েস। এটি আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাংলাদেশ প্রতিদিন তা গ্রহণ করেছে।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৯

দেবিদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়নের প্রেমু গ্রামে কোনো সোলার লাইন না বসিয়েই খরচ দেখানো হয়েছে। প্রেমু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সোলার লাইটটি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা রাজীব মুন্সির বাজেটের। এটাকেই হাসনাত আবদুল্লাহ তার কাজ বলে দাবি করেছেন। তাহলে সোলারের টাকা কোথায় গেল? দেবিদ্বারে সোলার লাইট বসানো নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর একটিই অভিযোগ না, এমন একাধিক অভিযোগের পাহাড় জমা এলাকাবাসীর কাছে। হোসেনপুর মধ্যপাড়া মোবারক মাস্টারের বাড়ির সামেন নেই কোনো সোলার বাতি। এমনকি, নন্দীবাড়ি সংযোগস্থলে হোসেনপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের সামনে তিন রাস্তার মোড়েও নেই কোনো সোলার বাতি। ফেসবুক ও স্থানীয়দের অভিযোগকারীদের হাসনাত আবদুল্লাহর ক্যাডাররা হুমকি দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অনুচ্ছেদ-৯ এর বিশ্লেষণ

এমপি হিসেবে হাসনাত আব্দুল্লাহের কাছে কোনো ফান্ড আসলে তার স্বচ্ছতা দেখিয়েছেন তিনি। তবে, স্থানীয় সরকারের অধীনের কাজ, এনজিও-এর কাজ, যা তার অধীন নয়, তাও হাসনাত আব্দুল্লাহের ঘাড়ে বসানোর চেষ্টা করেছে কালের কণ্ঠ। 

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-১০

সম্প্রতি বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন দুই নেতার বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার বৈষম্যের অভিযোগ তোলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারাই বৈষম্য করেছেন’। এ দুই নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া মোস্তাক মিয়ার বক্তব্যটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। এ বক্তব্য প্রচারের পর অভিযোগকারী মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ। এ সময় তাদের মধ্যে উচ্চবাচ্য বিনিময় হয়। সেই কথোপকথনও ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তাক মিয়া বলেছেন, ‘২৪-এর গণ অভ্যুত্থানে বিএনপিসহ সারা দেশের ছাত্র জনতার অংশগ্রহণে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। অথচ কতিপয় ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গায়ের জোরে অনিয়ম ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছেন।’ এ হলো হাসনাত আবদুল্লাহ। বাইরে তিনি স্বচ্ছতা, সুশাসন আর গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু ভিতরে তিনি বিশ্বাস করেন পেশিশক্তি আর মব। ভিন্নমত দমন করতে বল প্রয়োগ করেন। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে সমালোচকদের হুমকি দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসনাতের কর্মকাণ্ড একসময়ের লক্ষ্মীপুরের তাহের, ফেনীর জয়নাল হাজারীর কথা মনে করিয়ে দেয়। রাজনীতিতে তাহের, হাজারীর মতো গডফাদাররা বিদায় নিয়েছে, এখন নতুন গডফাদার তৈরি হচ্ছে?


অনুচ্ছেদ-১০ এর বিশ্লেষণ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকা করে জেলা পরিষদ থেকে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়। তবে, সেটির সত্যতা মেলেনি। মূলত প্রত্যেক উপজেলায় সমমান বা কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেই বরাদ্দ আসিফ মাহমুদ বা হাসনাত আব্দুল্লাহ নেননি। বরাদ্দ গিয়েছে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন দফতরে, যেখানে এই দুজনের কোনো হাত নেই। রাজনৈতিক কারণে বিএনপির নেতা কুমিল্লার জেলা প্রশাসক তা বলেছিলেন। তবে, সেটিকে ফ্রেমিং করে প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। এছাড়া, বসুন্ধরা গ্রুপের জন্য বিপজ্জনক হাসনাত আব্দুল্লাহকে জয়নাল হাজারীর চেয়ে ভয়ংকর দেখছে বাংলাদেশ প্রতিদিন গং। প্রতিবেদনের শেষে অজ্ঞাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাতে সম্ভাব্য গডফাদার বানানোর চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও কালের কণ্ঠ। 


জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বসুন্ধরা গ্রুপের সব সংবাদমাধ্যমের কাজ নিয়ে জাতীয় সংসদে সমালোচনা করেন হাসনাত আব্দল্লাহ।  এরপরই ‘‘হাসনাত আবদুল্লাহ : সাদা সাদা, কালা কালা’’ শিরোনামের প্রতিবেদন ২০২৬ সালের ২৮ জুন  ছাপা প্রকাশ করে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন। একই দিন একই মালিকের কালের কণ্ঠ ও বাংলা নিউজ ২৪ ডটকমে প্রকাশ হয় প্রতিবেদনটি। দুটি খবরের লিঙ্ক যুক্ত করা হলো- https://www.kalerkantho.com/online/Politics/2026/06/28/1703783 (কালের কণ্ঠ),  https://www.banglanews24.com/national/news/bd/1663228.details (বাংলানিউজ২৪) ।


নির্দেশিকা: এই সংবাদ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে লাল রঙের লেখা কালের কণ্ঠ পত্রিকার হুবহু আর কালো রঙের লেখা হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ।

হিউম্যান ভয়েসের বক্তব্য: সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়, কাউকে নিরপরাধ বা অপরাধ বানানোর জন্য নয়। সত্য সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠাকেই দায়িত্ব মনে করে হিউম্যান ভয়েস।

আরও পড়ুন