এইচভি প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪:৫৭, ৪ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৫:১০, ৪ জুলাই ২০২৬
ছবি: এআই
সংবাদমাধ্যমটিতে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে,যা সাংবাদিকতার কোনো নীতিমালা বা মানদণ্ড প্রয়োগ করেনি কালের কণ্ঠ। এর মধ্যে ‘‘গণতন্ত্র ধ্বংসের খেলায় মাঠে নেমেছেন হাসনাত’’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের এই পত্রিকাটির অনলাইন।
আজ প্রতিবেদনটির অনুচ্ছেদভিত্তিক বিশ্লেষণ করবে হিউম্যান ভয়েস ডটনিউজ। প্রথমত, বিশ্লেষণ টিম চটকদার শিরোনামের সঙ্গে প্রতিবেদনের কোনো মিল খুঁজে পায়নি।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-১
সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলো ক্ষমতার ভারসাম্য। আইন বিভাগ,শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ-সরকারের তিনটি বিভাগ যখন স্বাধীন এবং স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারে তখনই গণতন্ত্র বিকশিত হয়। কিন্তু আইন বিভাগ যদি বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করে কিংবা শাসন বিভাগ যদি বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে গণতন্ত্র হোঁচট খায়। আর এ কারণেই সরকারের তিনটি বিভাগকে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে কাজ করতে হয়। তিনটি বিভাগের ভারসাম্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।আদালতের এ আদেশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৬-৩ ভোটের এ রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা নিম্ন আদালতের একটি সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করা হয়েছিল। এভাবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে আদালতের রায় নিয়ে কথা বলা সংসদীয় রীতির পরিপন্থি। আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ভারতের পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে কথা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য লোকসভার একাধিক সদস্যের সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা গত বছর প্রদত্ত এক রুলিংয়ে বলেছেন, আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ওই বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। শুধু ভারতের লোকসভায় নয়,ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও আদালতের রায়ের পর সে বিষয়ে কথা বলা যায় না। হাউস অব কমন্সের রীতি অনুযায়ী,আদালতের রায়ের পর সেই রায়ের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে আলোচনা করা বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপের শামিল। এটা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-১
কালের কণ্ঠের ‘‘গণতন্ত্র ধ্বংসের খেলায় মাঠে নেমেছেন হাসনাত’’ শিরোনামের সঙ্গে প্রতিবেদনের ইন্ট্রো বা শুরুর কোনো মিল পায়নি হিউম্যান ভয়েস। সেখানে গণতন্ত্র বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে, যা গণতন্ত্র সংশ্লিষ্ট নয় বরং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাধীন পস্থা। মূলত বিচারাধীন একটি মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ,যা বসুন্ধরা গ্রপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রতিবেদনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ স্থগিতের বিষয়টি আনা হয়েছে। এটি একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ উদ্যোগে করেছিলেন। সেটি আদালত বাতিল করেছেন। আদালতের রায় নিয়ে ভারতের কথাও বলেছে কালের কণ্ঠ। ভারত নিজেই একটি স্বৈরশাসনের কবলে পড়েছে। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যে পুরো ভারত তোলপাড় সৃষ্টি হয়, যার ফলে জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি। যুক্তরাজ্য সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছে কালের কণ্ঠ। সম্প্রতি ধর্ষণে সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেটি হাউস অব কমন্সে আলোচনা হয়েছে।
দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-২
বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাইয়ের পর নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদের কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। দেশের মানুষ আশা করেছিল তরুণ সদস্যরা সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি শিখবেন, ভবিষ্যতে নিজেদের দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গড়ে তুলবেন। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সংসদের অধিবেশনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত কয়েকজন সদস্য শিখতে চান না,এঁদের লক্ষ্য হলো সংসদ ও গণতন্ত্র অকার্যকর করা। গণতন্ত্র ধ্বংস করে দেশে একটি জুলুম ও মবের রাজত্ব কায়েম করা। যেটা তাঁরা করতে চেয়েছিলেন ইউনূসের নেতৃত্বে।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-২
কালের কণ্ঠ তাদের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-২ এ নবনির্বাচিত সদস্যদের জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের ভাষ্য, বেশিরভাগ নতুন নির্বাচিত সদস্য সংসদের নিয়মকানুন জানেন না। অথচ, সংসদে নতুন নির্বাচিতরা শিক্ষিত ও চটপটে হিসেবে দেখেছে হিউম্যান ভয়েস। মূলত নতুনরা পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য বিশ্বায়নের গণতন্ত্র চর্চার উপর জোর দিচ্ছেন। তারা ক্যাডারভিত্তিক, পারিবারিকভিত্তিক রাজনীতির চিরধারা ভাঙতে চাইছেন। তারা গত ৫০ বছরের শোষণের রাজনীতির শিকল ভাঙার রাজনীতি করতে চাইছেন। এতে দেশের আপামর মানুষের সমর্থন রয়েছে, বিশেষ করে জেএনজির সমর্থন বেশি। কালের কণ্ঠ বিশেষ করে , এনসিপি থেকে নির্বাচিত এমপিদের দিকে ইঙ্গিত করে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কারণ, বসুন্ধরা গ্রুপ আওয়ামী লীগের মতো এনসিপি বা বিএনপিকে কাবু করতে পারেনি বলে জানতে পেরেছে হিউম্যান ভয়েস। এছাড়া, আওয়ামী লীগের মতো নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে কেউ যদি তাদের ব্যবসায় সুবিধা করে দিতে পারে তবে কালের কণ্ঠের কাছে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৩
এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের মূলহোতা জামায়াত-এনসিপি জোটের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এই সদস্যের একমাত্র লক্ষ্য হলো সংসদ বিতর্কিত, অকার্যকর এবং নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা। একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াত যেমন সংসদের বাইরে বলছে বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে তারা সময় দিতে চায় না। গণতন্ত্র বানচালের জন্য জামায়াত এখন রাজপথে উত্তাপ ছড়াতে চেষ্টা করছে। আর জামায়াতের লাঠিয়াল হিসেবে হাসনাত সংসদে অনভিপ্রেত ইস্যু এনে বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন। এর মাধ্যমে হাসনাত আবদুল্লাহ কেবল সংসদেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছেন না,গণতন্ত্রও ধ্বংসের চেষ্টা করছেন। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৩
বসুন্ধরা গ্রুপের বড় সমালোচক হাসনাত আব্দুল্লাহ। দ্যা ডিসেন্টের তথ্যা অনুযায়ী, চারদিনে ৯৯টা কনটেন্ট তৈরি করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের পাঁচটি মিডিয়া, যার অন্যতম হচ্ছে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন। সেই বাংলাদেশ প্রতিদিনের অপসাংবাদিকতার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে হাসনাতকে বিশৃঙ্খলাকারী হিসাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে কালের কণ্ঠ। বর্তমান সরকারকে সতর্ক করে জামায়াত ও হাসনাতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন প্রতিবেদক।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৪
জাতীয় সংসদে একদিকে যেমন তিনি নিজের জন্য সুযোগসুবিধা চাইছেন। যেমন গত এপ্রিলে হাসনাত বলেছিলেন,প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের জন্য সরকারি গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় ভাড়ায় গাড়ি চালিয়ে নির্বাচনি এলাকায় যাতায়াত করতে হয়,যা লোকলজ্জার কারণে কাউকে বলাও যায় না। মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ আরও সহজ করতে সরকারের কাছে একটি গাড়ির সুব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান তিনি।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৪
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংসদ সদস্যরা তিনটি গাড়ি কর ছাড়াই আমদানি করতে পারতেন। এবার বিএনপি সরকার ও বিরোধীদল জামায়াত ইসলামী ও অন্যান্য দলের নেতারা সেই সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা দেন। এমনকি, জামায়াতের নেতারা সরকারি গাড়ি নিতে চাননি। হাসনাত আব্দুল্লাহ শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে গাড়ি চেয়েছেন, তাও সবার জন্য। কারণ, তাদের জ্বালানি খরচ দেওয়া হয়।সরকারি গাড়ি শুধুমাত্র সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ের জন্য চাওয়া বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৫
আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসত্য,ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করছেন। হাসনাতের এসব কর্মকাণ্ড সংসদ সম্পর্কে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে। ২৫ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ সম্পর্কে কিছু অসত্য বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অযাচিত, অযৌক্তিক, আক্রমণাত্মক ও আপত্তিকর। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের অসত্য ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আদালত অবমাননা করেছেন। হাসনাতের ২৫ জুনের বক্তব্য ছিল সংসদীয় রীতির পরিপন্থি। এ ধরনের বক্তব্য সংবিধানের মৌলিক অধিকারেরও পরিপন্থি। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ২১ জুন সংসদে স্পিকার প্রদত্ত রুলিং লংঘন করেছেন। উল্লিখিত রুলিংয়ে স্পিকার বলেছেন,‘যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই,তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত। তাই ওই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে।’
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৫
কালের কণ্ঠের ভাষ্যমতে,সংসদীয় রীতির তোয়াক্কা না করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসত্য,ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করছেন বলছে।এই বিভিন্ন ব্যক্তিরা হলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহান, তার ছেলে সায়েম সোবহান আনভীর, সিয়াম সোবহান, সাদাত সোবহান, সাফিয়াত সোবহান, সাফওয়ান সোবহান প্রমুখ। আর প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে দৈনিক কালের কণ্ঠের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক শক্তি ও অর্থের জোরে সাব্বির হত্যা, মুনিয়া হত্যার মতো ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। এতে, বড় ভূমিকা পালন করেছে বসুন্ধরা গ্রুপের পাঁচটি মিডিয়া। হাসনাত আব্দুল্লাহ তার নিয়ম অনুযায়ী, বসুন্ধরা গ্রুপের সমালোচনা করেছেন এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কালের কণ্ঠ সংসদে মামুনুল হকের ব্যক্তিগত বিষয়ে বিএনপির এক এমপির বক্তব্যকে বুঝিয়েছে। সেটি দিয়ে আনভীর ও বসুন্ধরা গ্রুপের আওয়ামী প্রীতি ঢাকার চেষ্টা দেখেছে হিউম্যান ভয়েস।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৬
একই সঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির লঙ্ঘন। কার্যপ্রণালি বিধির ২৭০ এর(১) উপধারায় বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য, (৬) উপধারায় কোনো প্রকার অশালীন,কটু ও অশ্লীল শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং (৭) উপধারায় মানহানিকর মন্তব্য করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তার চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,হাসনাত তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে আদালত অবমাননা করেছেন। হাসনাতের বক্তব্যে আদালতের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ব্যক্তিকে খুনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় যাঁর বিরুদ্ধে হাসনাত অসত্য, মিথ্যা ও আক্রোশমূলক বক্তব্য দিয়েছেন তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। হাসনাত-উল্লিখিত ঘটনার নিষ্পত্তি হয়েছে ২০২৩ সালেই। ২০২১ সালে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট গুলশান থানার মামলা ২৭(৪)২১ উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেন।
দীর্ঘ কয়েক মাসের শুনানি এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের পর বিচারক অভিযোগ থেকে আসামিকে অব্যাহতি দেন। এর বিরুদ্ধে বাদীপক্ষ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ নারাজি দরখাস্ত করে। সব পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তিতর্কের আলোকে আদালত নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক অভিযুক্তকে নির্দোষ এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তহীন বলে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। এটি আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া একটি বিষয়। এটি আবার নতুন করে জাতীয় সংসদে কেন আনলেন হাসনাত আবদুল্লাহ? কারণ তিনি আইনের শাসন মানেন না,মব সন্ত্রাসের মাস্টারমাইন্ড হলেন হাসনাত। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাসনাতের এ বক্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং বিচার বিভাগের প্রতি সরাসরি হুমকি।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৬
হাসনাত আব্দুল্লাহ বিভিন্ন সময়ে সায়েব সোবহান আনভীর ও মুনিয়ার ঘটনা বারবার সামনে আনেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক দাপটে মুনিয়া হত্যার বিচার হয়নি বলে বিশ্বাস করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করেই মুনিয়া হত্যা থেকে খালাস পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন এই তরুণ এনসিপির নেতা। বসুন্ধরা ও সোবহান পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলায় হাসনাতকে মব সন্ত্রাসী বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত দৈনিক কালের কণ্ঠ।আর বিশেষজ্ঞের নাম ছাড়াই বিশেষজ্ঞদের মনের কথা লিখে দিয়েছেন প্রতিবেদন যা সাংবাদিকতার পরিপন্থী।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৮
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়,হাসনাতের উত্থান হয়েছে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে। মব হলো আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রধান শত্রু। হাসনাত মব করে গণমাধ্যম অফিস দখল করেছেন। মব করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। মব করে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন,চাঁদাবাজি করেছেন। আইন-বিচার তোয়াক্কা না করে ভয় দেখিয়ে সবাইকে দমিয়ে রাখাই হলো হাসনাতের রাজনীতি। এটা কোনো গণতান্ত্রিক চিন্তা বা সংস্কৃতি হতে পারে না। বরং এটা নব্য ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা। তাঁর কর্মকাণ্ড থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী’ প্রবণতাকে অনুসরণ ও সমর্থন করছেন; যে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমাটি এনসিপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের জন্য ব্যবহার করে।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৮
বসুন্ধরা গ্রুপের আরেকটি সংবাদপত্রের বরাতে মালিকপক্ষ বলতে চেষ্টা করেছে যে, হাসনাত সন্ত্রাস, মব সন্ত্রাস।অর্থ ও প্রতাপের গ্যাড়াকলে পড়া আইনের বিরুদ্ধে হাসনাত। তাকে গণমাধ্যম অফিস দখল, বিচারপতিদের পদত্যাগের যেসব অভিযোগ কালের কণ্ঠ দিচ্ছে, তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি বসুন্ধরা গ্রুপের এই পত্রিকাটি।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৯
হাসনাত কেবল একটি শিল্প পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি দেননি,গোটা বেসরকারি খাতকে হুমকি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে বেসরকারি খাতে ইতোমধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয়ে কথা বলে হাসনাত আসলে আবারও বিচার বিভাগকে ধমক দিলেন। এটা সুস্পষ্টভাবে আদালত অবমাননা। শুধু তাই নয়, এটা সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থি। আসলে হাসনাত আবদুল্লাহ কার হয়ে খেলছেন? বাংলাদেশে অনেক রক্তের বিনিময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এবং গণতন্ত্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা এই গণতন্ত্র ধ্বংসের খেলায় মেতেছে। জামায়াতের নতুন করে গণ অভ্যুত্থানের হুমকি আর সংসদে দাঁড়িয়ে হাসনাতের হুংকার একসূত্রে বাঁধা। হাসনাত কি আবার মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিপন্ন করতে চান, সেজন্যই সংসদে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে বিচার বিভাগ ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হুমকি দিচ্ছেন? মনে রাখতে হবে,হাসনাতের মতো মব সন্ত্রাসের হোতারা দেশের গণতন্ত্র,আইনের শাসন ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি। এঁদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে গণতন্ত্রকামী সবাইকে।
হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ অনুচ্ছেদ-৯
হাসনাত আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠ পত্রিকার মালিক বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে অভিযোগ করেন। এতে ব্যবসায়ীক, সামাজিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ট বসুন্ধরা গ্রুপ। এছাড়া, মুনিয়া হত্যার বিষয়টি বারবার বলায় মালিক পক্ষ হাসনাত আব্দুল্লাহের বিরুদ্ধে গুজব খবর প্রচারে চাপ সৃষ্টি করেছে বলে জেনেছে হিউম্যান ভয়েস। নিজেদের সকল অবৈধ বাণিজ্য, অপরাধ ঢাকার জন্যই সবধরনের পস্থা নিচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ। আর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে তাদের ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেড।
নির্দেশিকা: এই সংবাদ বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে লাল রঙের লেখা কালের কণ্ঠ পত্রিকার হুবহু আর কালো রঙের লেখা হিউম্যান ভয়েসের বিশ্লেষণ। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের অনলাইন লিঙ্ক সংযুক্ত করা হলো- https://www.kalerkantho.com/online/Politics/2026/07/02/1705753
হিউম্যান ভয়েসের বক্তব্য: সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়, কাউকে নিরপরাধ বা অপরাধ বানানোর জন্য নয়। সত্য সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠাকেই দায়িত্ব মনে করে হিউম্যান ভয়েস।