ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে দলীয়করণের পথে বিএনপি সরকার

এমডি কাওসার আহমেদ

প্রকাশ: ১৭:৪৬, ৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০০:৪৬, ৯ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে দলীয়করণের পথে বিএনপি সরকার

তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলছে বর্তমান বিএনপি সরকার।- ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসে রাজনীতির ময়দানে স্বজনপ্রীতিকরণ, দলীয়করণ একটি চিরাচরিত ধারা। তবে সেটি তার জনকল্যাণের সীমা পেরিয়ে গেলে তা বদভ্যাস ও ভয়ানক পরিণতিতে রূপ নেয়। ইতিহাসও তাই সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান, হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, সর্বশেষ শেখ হাসিনার সরকারের শাসনকাল তার উজ্জ্বল উদাহরণ। 

সম্প্রতি একই ধারায় হাঁটছে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে নিজেদের লোককে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদায়ন তার প্রমাণ। তার মধ্য দিয়েই দলীয়করণের পথে যাত্রা শুরু করেছে বিএনপি সরকার।

যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরেছেন কিংবা মনোনয়নে প্রতিযোগিতায় ছিঁটকে পড়েছিলেন দল থেকে, তাদেরই প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থ্যাৎ নিজ দলের ভেতরে অপছন্দ ও জনগণের কাছে অপছন্দের লোকদের আবার জনগণের ঘাঁড়ে বসালো সরকার। এটি শুধু মাত্র দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বা স্থানীয় দলীয় নেতাদের খুশি করতেই এমন জনআকাঙ্খাবিরোধী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

নির্বাচনের পর দেশের ২৪তম মন্ত্রীসভা গঠনের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সেবাখাতের বড় অংশ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের পথে হাঁটে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সেখানে প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম দলীয়করণের যাত্রা শুরু হয়। ১৮ ফ্রেবুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার চারদিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালামকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক করা হয়। তাঁর সঙ্গে আরো পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে নিজেদের দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসায় সরকার। ঢাকার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক করা হয় বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খানকে, যিনি ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করে হেরে যান। সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে করা হয় খুলনার প্রশাসক।

গাজীপুর মহানগর বিএনপি সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে করা হয়েছে গাজীপুরে প্রশাসক। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক করা হয়েছে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে।

তখন রাজনৈতিক নেতাদের প্রশাসক দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক প্রশাসকরা সিটি করপোরেশনে ভালো কাজ করতে পারবেন। তাই অকার্যকর স্থানীয় সরকারকে সচল করার জন্য সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক প্রশাসক বসানো হয়েছে"।

তবে, তার ব্যাখ্যার পরিবর্তে ভিন্ন  চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনের অনিয়ম চোখে পড়ার মতো। ফুটপাথ দখল শেষে এখন রাস্তায় দাগ কেটে হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে ফুটপাথ থেকে অনেক অর্থ নিম্নসারীর নেতা থেকে উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে। এছাড়া, সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ নানা ব্যবসা সরাসরি কোনো সরকারি প্রশাসকের তদারিক ছাড়াই দলীয় নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। 

৬টি সিটি কর্রোরেশনের পর থেমে থাকেনি স্থানীয় সরকার। দেশের ১২টির মধ্যে ছয়টি সির্টি কর্পোরেশনে নিজেদের প্রশাসক বসানোর পর ১৪ই মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লাতেও বিএনপি নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।

বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রুকুনোজ্জামান রোকন, রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী চৌধুরী, কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা নিজ নিজ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

এর আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতের রায়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটির মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা ও দলের নগর শাখার সাবেক আহবায়ক শাহাদাত হোসেন। সবকিছু মিলিয়ে দেশের স্থানীয় সরকারের সব বড় প্রতিষ্ঠান বিএনপির নেতাদের দখলে রয়েছে।

রাজনীতিবিদদের কাজ হচ্ছে, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে জনকল্যাণের কাজ করতে তাগাদা দেওয়া প্রশাসককে। প্রশাসকেরা সেটা দ্রুত করছেন কিনা তার পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু প্রশাসনের লোকেরা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন আর রাজনৈতিক নেতারা প্রশাসক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছেন। এতে নূন্যতম জবাবদিহিতার প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া, জামায়াত ইসলামীর মতো বিরোধী দল, যারা বিএনপির সাবেক মিত্র, তাদের কাছ থেকে শক্ত জবাবদিহিতার আশা করাও বোকামি।

যদিও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগীর তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে জানান, “জনগণের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতেই সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে``।  এটা রাজনৈতিক ভাওতাবাজি ছাড়া কিছুই  নয়।

দেশের সব সিটি কর্পোরেশনে যখন দলীয় নেতাদের রমরমা রাজনৈতিক বাণিজ্য চলছে তখনই ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ সরকার এক প্রজ্ঞাপনে ৪২টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়। যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা সবাই নিজ নিজ জেলায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতা।

রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়ে মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, দিনাজপুরে মোফাজ্জল হোসেন দুলাল, রংপুরে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, কুড়িগ্রামে সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, গাইবান্ধায় সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিককে,  রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাটে মাসুদ রানা প্রধান, বগুড়ায় এ কে এম আহাসানুল তৈয়ব জাকির, চাঁপাইনবাবগঞ্জে হারুনুর রশিদ (পরাজিত এমপি), নওগাঁয়  আবু বক্কর সিদ্দিক, রাজশাহীতে এরশাদ আলী, নাটোরে রহিম নেওয়াজ,  খুলনা বিভাগের মেহেরপুরে জাভেদ মাসুদ, কুষ্টিয়ায় সোহরাব উদ্দিন, ঝিনাইদহে আবুল মজিদ, যশোরে দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, মাগুরায় আলী আহমেদ, বাগেরহাটে শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, খুলনায় এস এম মনিরুল হাসান (বাপ্পী), বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালীতে স্নেহাংশু সরকার, ভোলাতে গোলাম নবী আলমগীর, বরিশালে আকন কুদ্দুসর রহমান, ঝালকাঠিতে শাহাদাৎ হোসেন, পিরোজপুরে আলমগীর হোসেন,  ময়মনসিংহ বিভাগের টাঙ্গাইলে এস এম ওবায়দুল হক, শেরপুরে এ বি এম মামুনুর রশিদ, ময়মনসিংহে সৈয়দ এমরান সালেহ, নেত্রকোণার নূরুজ্জামান, কিশোরগঞ্জের খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, ঢাকা বিভাগের  মুন্সীগঞ্জে এ কে এম ইরাদত, নারায়ণগঞ্জে মামুন মাহমুদ, রাজবাড়ীতে আব্দুস সালাম মিয়া, গোপালগঞ্জে শরিফ রফিক উজ্জামান, মাদারীপুরে খোন্দকার মাশুকুর রহমান, শরীয়তপুরে সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন, সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের মিজানুর রহমান চৌধুরী,  সিলেটে আবুল কাহের চৌধুরী, মৌলভীবাজারে মিজানুর রহমান, চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিরাজুল ইসলাম, কুমিল্লায় মোশতাক মিয়া, নোয়াখালীতে হারুনুর রশিদ আজাদ, লক্ষ্মীপুরে সাহাব উদ্দিন, কক্সবাজারে এ টি এম নুরুল বশর চৌধুরীকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

সারাদেশের স্থানীয় সরকারের অধীনে এখন যত কাজ হচ্ছে তা শুধুমাত্র দলীয় নেতাদের অধীনেই হচ্ছে। সেখানে প্রশাসনের তেমন জটিলতা নেই। এই সুযোগে দলীয় প্রশাসকেরা নিজেদের পকেট অদৃশ্যভাবে ভরে নিচ্ছেন। গত ১৭ বছর যারা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তারা এখন নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রশাসক নিজ দলের হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেকটা নিরুপায় হয়ে তা নিশ্চুপ হয়ে মেনে নিচ্ছে। 

দায়িত্ব নেবার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন। মনে হচ্ছে, বছর খানেক না পার হলে তিনি স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের পথে হাঁটবেন না। দলীয় নেতাদের পকেটভারী আর ভবিষ্যতে নির্বাচনের জন্য নিজেদের দলের অবস্থান ভারী না করা পর্যন্ত তিনি স্থানীয় নির্বাচন চাইবেন না।

সারাদেশে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে যখন চলছিল হইচই, তার মধ্যেই আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

মোস্তাকুর রহমানকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কর্পোরেট অর্থায়ন, শিল্প ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বিষয়ে বিশেষ দক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ভদ্রলোক হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত। গভর্নর বিজিএমইএ’র বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছিলেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের বোর্ড সদস্য। এছাড়া তিনি ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই), রিহ্যাব, এবং আটাব-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য। এছাড়া তিনি ইনস্টিটিউট অফ কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) একজন ফেলো মেম্বার।

মোস্তাকুর রহমানের আর্থিক ব্যবস্থার সুশাসন, ব্যাংকিং ও শিল্প অর্থায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি তদারকিতে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। রপ্তানি ও মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থাপনায় তিনি অভিজ্ঞ। এছাড়া করপোরেট এবং রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি.কম (অনার্স) এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও ১৯৯২ সালে তিনি আইসিএমএবি থেকে পেশাদার ডিগ্রি অর্জন করেন।

ব্যাংকে দীর্ঘদিন কাজ করা ছাড়া এসব যোগ্যতার লোক কখনো আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারেননি। তবে, সবাইকে অবাক করে সরকার তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করে বসে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন বিএনপির বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মন্ত্রী যাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করেছেন তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২৩তম সদস্য ছিলেন। তার নিয়োগ নিয়ে সাফাইও গেয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

আগের গভর্নর আহসান মনসুরের সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের পাশাপাশি ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর অনিয়ম নিয়ে যৌথ তদন্ত শুরু হয়েছিল। সেগুলো হলো- এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে লুট হওয়া অর্থ দেশে ও বিদেশ থেকে উদ্ধারে কাজ করছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখনকার গভর্নরের সময়কালে সব তদন্ত ও অগ্রগতিতে মন্তর গতি এসেছে। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় একজন রাজনীতিবিদকে গভর্নরের আসনে বসানো কতটুকু দলীয়করণ তার ইয়াত্তা বিরোধীদলের কাছেও নেই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের, কারো ভাষায় বিপ্লব আবার কারো ভাষায় গণঅভ্যুত্থান, পর শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রীসভার সবাই পলায়ন করেছিল। এরপর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিজেদের পছন্দের লোকদের প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানে বসানোর অভিযোগ উঠে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টা মাহফুজুর রহমান প্রকাশ্যে অভিযোগটি করেছিলেন গণমাধ্যমে। এতে বোঝা যায়, বিএনপি আগে থেকেই পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনে তাদের চাহিদামতো লোককে বসিয়ে রেখেছে।

২০০৮ সালের পর শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পরিবারের সবাইকে নানা জায়গায় নানা কায়দায় পদায়ন করেছিলেন। তারা দাপটের সঙ্গে তার হাতকে শক্তিশালী করেছিলেন। যেসব এলাকায় তার আত্মীয় ছিল না, সেসব এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে রাজ কায়েম করেছিলেন। কিন্তু ১৭ বছর পর মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, জনকল্যাণের চেয়ে আওয়ামী লীগ কল্যাণ বেশী হচ্ছে। এতে জনগণ ফুঁসে উঠলে আওয়ামী লীগকে দেশ ছেড়েই পালাতে হয়েছে। শেখ হাসিনার অনুসরণে যদি রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গে বিএনপি দলীয়করণের যাত্রা আঁকড়ে ধরে, তবে দল হিসেবে বিএনপি একই যাত্রায় পথযাত্রী হতেই পারে।

লেখক- প্রবাসী সাংবাদিক, সম্পাদক, হিউম্যান ভয়েস। 
 

আরও পড়ুন