ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যে ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মেয়ে

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬:৪৬, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৬:৪৮, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যে ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মেয়ে

ছবি: সংগৃহীত

জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের মধ্যে সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও পারিবারিক বলয়ের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ ও মামলা সামনে এসেছে। এর মধ্যে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশে দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছে।

২০২৪ সালের শুরুতে পাঁচ বছরের মেয়াদে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা ওয়াজেদ। তবে বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা করে। ২০২৫ সালের মার্চে করা ওই মামলার পর একই বছরের জুলাইয়ে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরে ডব্লিউএইচও তাকে অবৈতনিক প্রশাসনিক ছুটিতে রাখে।

রয়টার্সের দেখা গত ৩ জুলাই ডব্লিউএইচওকে দেওয়া সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীদের চিঠিতে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক জালিয়াতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি। তবে সায়মা ওয়াজেদ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ আরও বলেন, বাংলাদেশে বেআইনিভাবে একটি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, ডব্লিউএইচওতে যোগদানের আগেই ওই জমি তিনি পেয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত আইনের আওতায় ওই জমি পাওয়ার বৈধ অধিকার তার ছিল।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুসকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে সংস্থাটির নেতৃত্ব নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সায়মা। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিকভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। ফলে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর তার আর বিশ্বাস ও আস্থা নেই।

পদত্যাগপত্রে তিনি আরও জানান, প্রায় এক বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তার আর্থিক পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। অবৈতনিক ছুটিতে থাকার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে পদত্যাগের বিষয়ে নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সায়মা ওয়াজেদ। ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে সংস্থাটি গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিস্তারিত জানানো থেকে বিরত ছিল। শুধু তাকে ছুটিতে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল সংস্থাটি। একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর আঞ্চলিক পরিচালকের পদে নতুন মনোনয়ন আহ্বান করা হতে পারে। ডিসেম্বরে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০২৭ সালের ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্ব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। কোনো মহামারি, সংক্রামক রোগের বিস্তার কিংবা জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব থাকে এই পদে থাকা কর্মকর্তার ওপর। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনস্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আঞ্চলিক পরিচালক।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন সদস্য দেশগুলোর ভোটে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলের সদস্যরাষ্ট্রগুলো এতে অংশ নেয় এবং প্রতি পাঁচ বছর পরপর এ পদে নির্বাচন হয়।

চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে গত জুলাইয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদ তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তার দাবি, ৯০১ ডলারের ওই অর্থসংক্রান্ত বিষয়টি কোনো পরিকল্পিত জালিয়াতি নয়; বরং তার এক সহকারী নিয়মিত বিল দাখিলের সময় প্রশাসনিক অসাবধানতার কারণে ভুলটি করেছিলেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। সায়মার দাবি, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন। এ যোগ্যতার বিষয়টি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালককে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে তার দায়িত্বের অবসান ঘটল। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যায়ে ওঠা অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন