ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

বিদেশি ঋণ শোধে রেকর্ড, পাঁচ মাসে পরিশোধ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার

বাসস

প্রকাশ: ০৮:৩১, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদেশি ঋণ শোধে রেকর্ড, পাঁচ মাসে পরিশোধ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার

ছবি: সংগৃহীত

দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে পরিশোধ করা এ অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেকোনো পাঁচ মাসের সময় বিবেচনায় বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ। আগের সরকারের সময়ে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়লেও বর্তমান সরকার নিয়মিতভাবে এ দায় পরিশোধ করে যাচ্ছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের মার্চ-জুলাই সময়ে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৫ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পরিশোধ করা ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের মধ্যে ঋণের আসল বাবদ ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তির চাপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দায়িত্ব নেয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পূর্ববর্তী সময়ে নেওয়া বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান কিস্তি পরিশোধ।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, আগের সরকারের সময়ে বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের নামে নেওয়া বিপুল অঙ্কের বিদেশি ঋণের অনেকগুলোর কিস্তি এখন পরিশোধের পর্যায়ে এসেছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশের অবকাশকাল বা গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় বর্তমান সরকারের সময়ে আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাসসকে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাপকভাবে ঋণ নিয়েছে। এসব ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল এবং ঋণের সুদের হার যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতেও ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন কারণে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক দায় ও ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে। এখন আগের সরকারের রেখে যাওয়া এসব দায় বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।

‘আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। তারপরও সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিতভাবে এসব দায় পরিশোধ করে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

নতুন ঋণে সতর্ক সরকার

আগের সরকার যথেচ্ছ ঋণ নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা রেখে গেছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার দেশি-বিদেশি যেকোনো ধরনের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগ, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে গতিশীলতা বাড়ানোর জন্য ঋণের ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঋণ নিলে তার বিপরীতে কী রিটার্ন আসবে এবং কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হবে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।’

সরকারের নতুন ঋণনীতিতে শুধু অর্থ সংগ্রহের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে, সেই বিনিয়োগ থেকে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা থাকবে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ঋণ পরিশোধ

ইআরডির পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৭ কোটি ডলারে। পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরও বেড়ে ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৯ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি ঋণ পরিশোধের বর্তমান চাপ মূলত সাম্প্রতিক সময়ে নেওয়া নতুন ঋণের কারণে নয়। বরং আগের বছরগুলোতে বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় শুরু হওয়ায় সরকারের দায় বেড়েছে।

আগের দেড় দশকে নেওয়া বিভিন্ন বড় প্রকল্পের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। ফলে একই সময়ে একদিকে ঋণের আসল এবং অন্যদিকে সুদ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার একদিকে আগের সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের দায় নিয়মিত পরিশোধ করছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, নিয়মিতভাবে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতাদের কাছে বাংলাদেশের দায় পরিশোধের সক্ষমতা এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন