ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

রেস্টুরেন্টের তরুণী থেকে তুরাগ নদে মরদেহ

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬:৫৭, ১ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৬:৫৮, ১ নভেম্বর ২০২৬

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। বাসা থেকে বন্ধুর ডাকে বের হওয়ার পর উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এক তরুণীর সঙ্গে সময় কাটানো, পরে জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত তুরাগ নদে তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্যে বেশ কিছু অজানা যোগসূত্র সামনে এসেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তাহসিফ। তবে কেন তাকে ধাওয়া করা হয়েছিল, কারা ধাওয়া করেছিলেন এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর কী ঘটেছিল, তার কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

ঘটনার রাতে উত্তরার রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। অন্যদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় বাবার করা হত্যা মামলায় দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়াও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।

বাসা থেকে বের হওয়ার পর যেভাবে শুরু রহস্যের

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ না পাওয়ায় নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

তবে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং কী কারণে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছেছিলেন, তা প্রথমদিকে স্পষ্ট ছিল না। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার চলাচলের কিছু তথ্য জানতে পারেন তদন্তকারীরা।

রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার রেস্টুরেন্টে

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ রোডে অবস্থিত নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যান তাহসিফ। তার সঙ্গে ছিলেন এক তরুণী। তারা মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান। পরে জুনিয়র বন্ধু দীপও তাদের সঙ্গে ছিলেন।

রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই তরুণীর পরনে ছিল গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস। তার হাতে ছিল একটি সাদা পলিথিন। বয়স আনুমানিক ২৪ থেকে ২৫ বছর বলে ধারণা করছে পুলিশ। ফুটেজে দীপকে হেলমেট পরা অবস্থায় তাহসিফের সঙ্গে দেখা যায়।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ওই রেস্টুরেন্ট ও বারে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান তারা। এরপর তাহসিফ ও দীপ সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তবে তরুণী তাদের সঙ্গে বের হয়েছিলেন কি না কিংবা পরে তাদের সঙ্গে টঙ্গীতে গিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ এখন ওই তরুণীকে শনাক্তের চেষ্টা করছে। তার পরিচয় ও তাহসিফের সঙ্গে সম্পর্ক জানা গেলে ঘটনার আগের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

রাতের খাবার, বান্ধবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও টঙ্গীর পথে যাত্রা

উত্তরার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে তাহসিফ ও দীপের গতিবিধি নিয়েও নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে দীপের সঙ্গে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর রাত ৮টা ৫৪ মিনিটের দিকে উত্তরার রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের শপিং কমপ্লেক্সে অবস্থিত কুকরুকু রেস্টুরেন্টে দীপের সঙ্গে খাবার খেতে দেখা যায় তাকে।

সেখানে অবস্থানকালে বান্ধবী তাবাসসুমকে ফোন করে দেখা করতে বলেন তাহসিফ। পরে তাকে নিয়ে নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও ওই তরুণী একটি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান। কিছুক্ষণ পর পৃথক মোটরসাইকেলে আসেন দীপ। তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন।

আরও একটি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও তরুণী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। দীপ হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছানোর পর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর ওই তরুণীকে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তির দিকে রওনা হন। তবে তরুণীকে কোথায় নামানো হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

মধ্যরাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে কী ঘটেছিল

তাহসিফের মৃত্যুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যজনক অংশটি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায়। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ওই রাতের কিছু গতিবিধির তথ্য পেয়েছেন।

একটি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাজার বস্তি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে বলা হয়েছে, রাত ১২টা ১৭ মিনিটের দিকে তিনটি মোটরসাইকেলে ছয়জনকে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে দীপও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের পেছনে আসা আরেকটি মোটরসাইকেল ঘুরে অন্যদিকে চলে যায়।

এর প্রায় ২৩ মিনিট পর, রাত ১২টা ৩৯ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে তাহসিফকে একা মোটরসাইকেল চালিয়ে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা যায়।

এরপর রাত ১টার দিকে মাজার গেটসংলগ্ন এলাকা দিয়ে তাহসিফকে এক যুবকের সঙ্গে এবং দীপকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে হেঁটে তুরাগ নদসংলগ্ন মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। এ সময় রাস্তার পাশের দোকান থেকে বের হওয়া আরও দুই যুবককে ডেকে তাদের সঙ্গে কথা বলেন তাহসিফ। পরে ওই দুজনও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। সব মিলিয়ে সাতজনকে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপকে একা মাঠ থেকে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। তার হাতে ছিল একটি হেলমেট এবং কোমরে ছিল কালো রঙের ব্যাগ। এরপর মাঠের বাইরে কয়েকজনকে ফোনে কথা বলতে এবং মাঠের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে দেখা যায়।

এই ফুটেজের সঙ্গে দীপের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি রয়েছে। কারণ জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন, ওই এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে তিনি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। অথচ প্রকাশিত সিসিটিভি বিশ্লেষণে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। তবে ফুটেজে দেখা ব্যক্তিরা কারা, তারা কেন সেখানে গিয়েছিলেন এবং তাদের সঙ্গে তাহসিফের কী সম্পর্ক ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

পুলিশের ধাওয়া ও নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থানকালে কয়েকজন পোশাক পরা ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। তারা পুলিশের সদস্য ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময় তাহসিফ দৌড়ে নদীর দিকে চলে যান এবং তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। দীপ নিজে অন্যদিকে সরে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন বলে জানিয়েছেন।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এনায়েতুর রহমান মান্না জানিয়েছিলেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তার বর্ণনা যাচাই করতে তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে দীপকে নিয়ে গিয়ে তিনি কোথায় ছিলেন এবং কোন পথে গিয়েছিলেন, তা দেখানো হয়।

তদন্তের সময় ওই এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় এক চা-দোকানি জানান, মোটরসাইকেলটি প্রায় দুই দিন ধরে রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। কেউ সেটি নিতে আসেননি।

এখানে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। পোশাক পরা ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, তারা সত্যিই পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, কেন ধাওয়া করেছিলেন এবং তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।

এ ছাড়া দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থল থেকে সরে গিয়ে পরে তাহসিফকে খুঁজেছেন। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে তার একা বের হয়ে আসার দৃশ্য এবং অন্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি নতুন করে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

মাকে ফোনে বার্তা, কিন্তু আর ফেরা হয়নি

তাহসিফের পরিবারের বক্তব্য ও মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাতে ছেলের খোঁজ না পেয়ে তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাহসিফের ফোন থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি।’

কিন্তু ওই বার্তার পরও তাহসিফ বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি। পরদিনও তার কোনো সন্ধান না পেয়ে স্বজনদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাত ১টা ২০ মিনিটে দীপকে মাঠ থেকে একা বের হতে দেখা যাওয়ার তথ্য এবং রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে বাসায় ফেরার বার্তা পাঠানোর সময়ের মধ্যে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধান। বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন, তাহসিফ নিজে তখন কোথায় ছিলেন এবং তার ফোন কার নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পরদিন তুরাগ নদে মিলল মরদেহ

২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসার খবর পায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নৌপুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করেন।

প্রথমদিকে মরদেহটির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মরদেহটি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।

পরদিন ২৯ অক্টোবর ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

তাহসিফের বাবা শুরু থেকেই ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তার ধারণা, ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান তিনি।

দীপকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও হত্যা মামলা

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ২৯ অক্টোবর রাতে জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কারণ, তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন দীপ। সিসিটিভি ফুটেজেও বিভিন্ন স্থানে তাদের একসঙ্গে চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়।

পিবিআই দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাকে নিয়ে উত্তরাসহ টঙ্গীর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে। এ সময় তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখা হয়। পরে শুক্রবার রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরই মধ্যে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

শনিবার দুপুরে দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দীপ ঘটনার শুরু থেকে তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তার দেওয়া বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণও চলছে।

তদন্তে এখন যেসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ

তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তকারীদের সামনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

তরুণীর পরিচয়: ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যাওয়া তরুণী কে? তার সঙ্গে তাহসিফের কী সম্পর্ক ছিল এবং তিনি কখন কোথায় আলাদা হয়েছিলেন?

মাজার বস্তিতে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি: সিসিটিভি ফুটেজে একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেলেও দীপ কেন তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি? ওই ব্যক্তিরা কারা এবং তাদের সঙ্গে তাহসিফের সম্পর্ক কী?

পুলিশের ধাওয়ার ঘটনা: দীপের দাবি অনুযায়ী, পোশাক পরা ব্যক্তিরা কারা ছিলেন? তারা কি পুলিশের সদস্য, নাকি অন্য কেউ? কেন তারা তাহসিফ ও দীপকে ধাওয়া করেছিলেন?

নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার কারণ: তাহসিফ কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন? তিনি কি কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন?

দীপের বক্তব্যে অসংগতি: প্রথমদিকে নিজের সঙ্গে তাহসিফের চলাচল ও শেষ সময়ের ঘটনা সম্পর্কে দীপ যে তথ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজের সব তথ্যের মিল রয়েছে কি না?

মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন: তাহসিফের মোটরসাইকেল ঘটনাস্থলে কীভাবে পড়ে ছিল? রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তার ফোন থেকে পাঠানো ভয়েস বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন?

মৃত্যুর প্রকৃত কারণ: তাহসিফ পানিতে ডুবে মারা গেছেন, নাকি মৃত্যুর আগে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল? ময়নাতদন্ত, ভিসেরা ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সত্য উদ্ঘাটনের দাবি রাওয়ার

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়া।

শনিবার দুপুরে সংগঠনটির নেতারা উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনে তাহসিফের বাসায় যান। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, শোক প্রকাশ করেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। তারা দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করেন।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, তারা এ ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করবেন। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে চান তারা।

মৃত্যুরহস্যের জট খুলবে যেসব তথ্যে

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাতের বিভিন্ন সময়ে তার চলাচল, সঙ্গী এবং অবস্থান সম্পর্কে একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এসব ফুটেজে দীপ ছাড়াও একজন তরুণী এবং টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় আরও কয়েকজনের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে।

অন্যদিকে দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু তার এই বক্তব্যের সব অংশ এখনো তদন্তকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষ করে মাজার বস্তি এলাকায় একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি, দীপের একা ফিরে আসা এবং তাহসিফের ফোন থেকে পাঠানো শেষ বার্তার বিষয়গুলো নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এখন ওই তরুণী ও অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, সিসিটিভি ফুটেজের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও বার্তা পরীক্ষা, মোটরসাইকেলের অবস্থান এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করাই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি তিনি দুর্ঘটনাবশত নদীতে পড়ে মারা গেছেন, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। দীপের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় অভিযোগ আনা হলেও আদালতে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, মানবজমিন, জাগো নিউজ ও চ্যানেল আই অনলাইন।

আরও পড়ুন