ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

আবরার ফাহাদ

যে প্রশ্নের পর ছাত্রলীগের নির্যাতনে প্রাণ হারান বুয়েট শিক্ষার্থী

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬:৫২, ৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০৬:৫২, ৮ অক্টোবর ২০২৬

যে প্রশ্নের পর ছাত্রলীগের নির্যাতনে প্রাণ হারান বুয়েট শিক্ষার্থী

সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত হন। মৃত্যুর আগে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, পানি, বন্দর ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তার ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে তাকে শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয় বলে মামলার তদন্ত ও আদালতের নথিতে উঠে আসে। আবরার হত্যা পরবর্তী সময়ে বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ ক্যাম্পাসে দলীয় প্রভাব ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলনের সূত্রপাত করে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন

কুষ্টিয়ার আবরার ফাহাদ কুষ্টিয়া জিলা স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে বুয়েটে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করতেন তিনি।

২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারত সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা হয়। এর মধ্যে ভারতের পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে পানীয় জল সরবরাহের জন্য ফেনী নদী থেকে ভারতকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার বিষয় ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় এলপিজি পরিবহনের ব্যবস্থাও আলোচনায় আসে।

এসব বিষয় নিয়ে ৫ অক্টোবর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আবরার। সেখানে তিনি পানি, বন্দর ও জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ ভারতকে কী ধরনের সুবিধা দিচ্ছে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর আগেও ফারাক্কা, অভিন্ন নদীর পানি ও ভারতে ইলিশ পাঠানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনামূলক মতামত দিয়েছিলেন তিনি।

আবরারের এসব বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

‘শিবির’ সন্দেহে ডেকে নিয়ে নির্যাতন

আবরারের ফেসবুক পোস্ট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নজরে আসার পর ৬ অক্টোবর রাতে তাকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়।

মামলার তদন্ত ও আদালতের নথি অনুযায়ী, সেখানে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা হয় এবং ফেসবুক ও মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে দেখা হয়। তাকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এরপর তাকে দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, ক্রিকেটের স্টাম্পসহ বিভিন্ন বস্তু দিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তার মৃত্যু হয়।

৭ অক্টোবর ভোরে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ির কাছ থেকে ২১ বছর বয়সী আবরারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বুয়েটে ছাত্রলীগের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাব, শিক্ষার্থীদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

একজন শিক্ষার্থীকে কয়েক ঘণ্টা একটি আবাসিক হলে আটকে রেখে তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরীক্ষা এবং মারধরের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারল, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

আবরার হত্যার তদন্তে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তারা সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের বিচার, আবাসিক হলে নির্যাতন বন্ধ এবং ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্ররাজনীতির প্রভাব বন্ধের দাবি জানান।

বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ

আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর বুয়েটে সব ধরনের সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টে হয়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।

তবে এরপরও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। দণ্ডিত কয়েকজন আসামির আপিলের বিষয়টি উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

আবরারের স্মরণে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’

আবরার হত্যার পর তার নাম ও বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। ২০২০ সালে তার প্রথম শাহাদাতবার্ষিকীতে রাজধানীর পলাশী এলাকায় তার স্মরণে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়। পরে সেটি অপসারণ করা হয়।

২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পলাশী মোড়ে নতুন করে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ উদ্বোধন করা হয়। সেখানে সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, গণপ্রতিরক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দেশীয় শিল্প-কৃষি-নদী-বন-বন্দর রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার বিষয় তুলে ধরা হয়।

২০২৫ সালে ‘প্রতিবাদী তারুণ্য’ ক্ষেত্রে আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। তার মা রোকেয়া খাতুন ছেলের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

আবরার হত্যার সাত বছর

২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর আবরার হত্যার পর সাত বছর পেরিয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনাটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আবাসিক হলে নির্যাতনের বিষয়গুলোকে নতুন করে সামনে আনে।

আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বুয়েটের একজন শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয় বলে মামলার তদন্ত ও আদালতের নথিতে উঠে এসেছে।

তার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয় এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়।

আবরারের তোলা পানি, বন্দর, সীমান্ত, অভিন্ন নদী ও জাতীয় স্বার্থসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। ফলে তার হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ফৌজদারি মামলার ঘটনা হিসেবে নয়, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

আরও পড়ুন