ইউএনবি
প্রকাশ: ১১:০৭, ৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৮, ৫ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
জেলার পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জ উপজেলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বলছেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং শ্রেণিকক্ষে থাকার সময় বেড়েছে। দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জ উপজেলার ৩১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি চালু হয়। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা টিফিনের সময় বিনামূল্যে খাবার পাচ্ছে।
কর্মসূচির খাবারের তালিকায় রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ বান, ডিম, কলা ও ২০০ মিলিলিটারের দুধের প্যাকেট। সপ্তাহের প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের বান দেওয়া হয়। এর সঙ্গে এক দিন পরপর দুধ ও কলা এবং বাকি তিন দিন সিদ্ধ ডিম সরবরাহ করা হয়।
লালমনিরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাটগ্রাম উপজেলায় ২২ হাজার ৮২৯ এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৯ হাজার ৮৫০ শিশু প্রতিদিন এ খাবার পাচ্ছে।
চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য এ কর্মসূচির গুরুত্ব শুধু একবেলা খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক শিশু সকালে অল্প খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয় এবং দুপুর পেরিয়ে পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করে। কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে নদী পার হয়ে বা নৌকায় চড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়।
কালীগঞ্জের ভোটমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী তিস্তা নদীর ওপারের চরাঞ্চল থেকে আসে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান দুলু বলেন, আগে দুপুরের পর খাবারের অভাবে শিক্ষার্থীদের অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়ত এবং ক্লাসে মনোযোগ হারাত।
তিনি বলেন, এখন পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ। কোনো কোনো সময় শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থীর জায়গা করে দিতেও সমস্যা হচ্ছে।
মদনপুর বৈরাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেশনে হাসিন কিংবদন্তি ও তাসলিমা ইয়াসমিন হুমায়রা জানায়, ক্ষুধার কারণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থাকা আগে কঠিন ছিল। এখন সরকারি খাবার পাওয়ায় ক্লাসে থাকার শক্তি পাচ্ছে তারা এবং পড়াশোনায় মনোযোগও বাড়ছে।
অভিভাবক আজিজার রহমান ও মঞ্জুম আলী বলেন, তারা দরিদ্র মানুষ। প্রতিদিন সন্তানদের জন্য আলাদা টিফিন বা টিফিনের টাকা দেওয়া সম্ভব হয় না। সকালে বাড়িতে যে খাবার দেওয়া হয়, তা দিয়ে অনেক সময় পুরো স্কুলের সময় পার করা সম্ভব হয় না। তাই কর্মসূচিটি সারা দেশে চালুর দাবি জানান তারা।
লালমনিরহাটের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, কর্মসূচি চালুর আগে পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। স্কুল ফিডিং চালুর পর তা বেড়ে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পাশাপাশি পুষ্টি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ কর্মসূচিকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ঝরে পড়া কমানো এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে পরীক্ষামূলক এ উদ্যোগ সারা দেশে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীবেষ্টিত লালমনিরহাটে ৩৬টি চরাঞ্চল রয়েছে। এসব এলাকায় দারিদ্র্য, মৌসুমি বন্যা, নদীভাঙন ও যোগাযোগের দুর্ভোগের কারণে বিদ্যালয় পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন।
লালমনিরহাটের অভিজ্ঞতার মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের পুষ্টি ও শেখার ফলাফল উন্নত করতে দেশজুড়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে সরকার।
শিক্ষামন্ত্রী এম এহসানুল হক মিলন মার্চে জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ১৫০টি উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এ কর্মসূচির।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এ কর্মসূচির জন্য ৫ হাজার ৪৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে। দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী সপ্তাহে পাঁচ দিন পুষ্টিকর খাবার পাবে এ কর্মসূচির আওতায়।
তবে খাবারের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, পুষ্টিকর খাবার সরবরাহে কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। প্রতিদিনের জন্য বরাদ্দ খাবার সেদিনই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসূচিটি গ্রামীণ নারীদের জন্য আয়ের সুযোগও তৈরি করছে।
লালমনিরহাটে হাতীবান্ধার আল মদিনা বেকারিতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে বান তৈরি করা হচ্ছে। পরে সরকারি লোগোযুক্ত প্যাকেটে সেগুলো বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়।
অংশগ্রহণকারী বিদ্যালয়ের আশপাশের নারী বাসিন্দাদের মাধ্যমে সিদ্ধ ডিম ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) এ সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নারীদের তদারকি করছে।
ইএসডিওর জেলা ব্যবস্থাপক বাবুল আক্তার জামান বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের আশপাশের একজন নারীকে যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা প্রতি সপ্তাহে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন এবং কেউ কেউ মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা আরডিএ কর্মসূচির আওতায় ২০০ মিলিলিটারের দুধের প্যাকেট সরবরাহ করছে।
ফলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুধু চরাঞ্চলের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার উদ্যোগ হিসেবে নয়, প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের ছোট পরিসরে আয় করার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।