এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮:৫২, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৫৪, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাড়িটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদের যাতায়াত ছিল। মাসের অধিকাংশ দিন গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা চলায় আশপাশের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন তারা।
সোমবার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে তিনটি বোতলে আনুমানিক এক লিটার ৭০০ মিলিলিটার মদ, একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ কুশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া কনডমও উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬ জন তরুণী ছিলেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারদেরও সেখানে পাওয়া যায়। অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আটকদের মধ্যে কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরের রিঅ্যার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত এই কর্মকর্তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বুধবার মিন্টো রোডে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের আগে এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।
ঘটনাস্থলের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, হাউজিং সোসাইটির ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও উচ্চ শব্দে গান শোনা যাচ্ছিল। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দৌড়ে ভবনের ওপরের তলায় চলে যান। ভবনটির কয়েকটি কক্ষে নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে পাওয়া যায়।
ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো। বাড়িটির হোস্ট ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। মাহবুবুল আলম ছিলেন কো-হোস্ট।
মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে পুলিশ জানায়, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আয়োজনে ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। পাশাপাশি আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো।
তবে এসব আয়োজন থেকে মাসে মোট কত টাকা আয় হতো, কারা সেই অর্থ পেতেন এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে অর্থের লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।
ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, অভিযানে আটক পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বাড়িটির মালিকের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইলিয়াস কবির বলেন, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ঘটনায় মামলা হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাড়িটিতে পার্টির আয়োজন ও আয়ের ভাগ নিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, এয়ারবিএনবির নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক মূল হোস্ট। তবে তিনি নিজে এসব আয়োজন করতেন না। ব্যবস্থাপক হিসেবে মাহবুবুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তার ভাষ্য, মাহবুবুল আলমকে সব নিয়মকানুন মেনে চলতে এবং কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে জানাতে বলা হয়েছিল। প্রয়োজনে আয়োজন বন্ধ করার নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু ঘটনার পর তিনি জানতে পেরেছেন, ব্যবস্থাপক তাকে অনেক তথ্য জানাননি।
আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, ঘটনার দিন তার ধারণা ছিল, বাড়িটিতে ৩৫ থেকে ৪০ জন অতিথি রয়েছেন। অথচ আটক হয়েছেন এর প্রায় দ্বিগুণ মানুষ।
তিনি আরও বলেন, মাহবুবুল আলম সাজা ভোগ করে বের হলে তার কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চাইবেন। নিজের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে প্রমাণ পেলে তাকে আবারও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেবেন।
আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, ওই অর্থ বাড়ি ভাড়া বাবদ নিতেন তিনি। বাকি অর্থের নির্দিষ্ট অংশ মাহবুবুল আলম পেতেন। এ ছাড়া বাড়ির পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বাগান পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও অর্থ পেতেন বলে দাবি করেন তিনি।