ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘হিট স্টর্ম’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:২৫, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৪, ২১ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘হিট স্টর্ম’

সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে নির্দিষ্ট অঞ্চলে তীব্র গরমের ঘটনা দেখা গেলেও এখন দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর বিশাল অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। এমন ঘটনাকে ‘হিট স্টর্ম’ বা বিশাল তাপঝড় হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এতে দেখা গেছে, গত ছয় দশকে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ও বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

রয়টার্সের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৬৭ দিন স্থায়ী একটি তাপপ্রবাহ পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত হয়েছিল। ‘ভেরা’ নামের এই তাপঝড় এ ধরনের ঘটনার ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তৃতগুলোর একটি। এর প্রভাবে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ছয় দশকে বেড়েছে তাপঝড়ের সংখ্যা

রয়টার্সের বিশ্লেষণে ১৯৬০ সাল থেকে পৃথিবীর তাপমাত্রার তথ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টার তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণের পাশাপাশি দুই ডজনের বেশি আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকের মতামত নেওয়া হয়েছে। এতে তাপপ্রবাহের বিস্তার, স্থায়িত্ব ও তীব্রতার পরিবর্তন উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে বছরে গড়ে পাঁচটি হিট স্টর্ম দেখা যেত। চলতি দশকে সেই সংখ্যা বেড়ে গড়ে ১০২টিতে দাঁড়িয়েছে। ষাটের দশকে সবচেয়ে বড় তাপপ্রবাহটি পৃথিবীর প্রায় ৬ শতাংশ এলাকায় ৪৬ দিন ধরে বিস্তৃত ছিল। বিপরীতে, ভেরা নামের তাপঝড়টি ৩৬৭ দিন স্থায়ী হয়ে পৃথিবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকাকে কোনো না কোনো সময়ে প্রভাবিত করে।

রয়টার্সের ব্যবহৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে টানা পাঁচ দিন বা তার বেশি সময় অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে সেটিকে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এমন তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় পৃথিবীর অন্তত ১ শতাংশ এলাকা দখল করলে সেটিকে ‘হিট স্টর্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি মূলত বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত একটি শ্রেণিবিন্যাস।

ফিলিপাইনে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

ভেরা তাপঝড়ের প্রভাবে ফিলিপাইনের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। দেশটির অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ক্লাস করতে হয়।

ম্যানিলার শিক্ষক জোয়েল আরোজাদোর বর্ণনা অনুযায়ী, তীব্র গরমের মধ্যে এক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে মাথা নিচু করে কাঁদছিল। পরে শিক্ষক দেখতে পান, তার মুখ ও বুকে রক্ত লেগে আছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিশুটির নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। ঘটনাটি তাপপ্রবাহের কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি চিত্র তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহস্টশন ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে শারীরিক পরিশ্রম করেন এমন মানুষ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রে খরা ও দাবানলের বিস্তার

২০২৩ সালের আগস্টে ভেরা তাপঝড় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত হয়। টেক্সাসসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচণ্ড গরমের কারণে বাইরে কাজ করা এবং খেলাধুলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে খেলাধুলা করায় ক্রীড়াবিদদের অসুস্থতা ও আঘাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

একই তাপঝড়ের প্রভাবে দক্ষিণ লুইজিয়ানায় দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। সেখানে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্যটির গভর্নর ওই সময়ের আগুনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু আগস্ট মাসেই সেখানে প্রায় ৬০০টি অন্যান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

তীব্র তাপ ও শুষ্ক আবহাওয়া একসঙ্গে দেখা দিলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, গাছপালা দ্রুত শুকিয়ে পড়ে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে তাপপ্রবাহ ও দাবানল পরস্পরের ক্ষতিকর প্রভাব বাড়াতে পারে।

আমাজনে ডলফিনের মৃত্যু

ভেরা তাপঝড়ের আরেকটি ভয়াবহ প্রভাব দেখা যায় ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আমাজনের তেফে হ্রদে বিপুলসংখ্যক ডলফিনের মৃত্যু হয়। তীব্র গরমের পাশাপাশি দাবানলের ধোঁয়া ও পানিতে শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

প্রতিবেদনে পরিবেশবিজ্ঞানী আয়ান ফ্লাইশম্যানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি একটি ডলফিনকে অসুস্থ অবস্থায় ছটফট করতে করতে মারা যেতে দেখেছিলেন। হ্রদের তীরে ছড়িয়ে থাকা ডলফিনের মরদেহ এবং পানির অস্বাভাবিক রং জলজ পরিবেশের সংকটের ভয়াবহতা প্রকাশ করে।

অতিরিক্ত তাপে হ্রদ ও নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জলজ প্রাণীর ওপর চাপ তৈরি হয়। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তারও প্রাণীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রাণীর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে আলাদা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

আফ্রিকায় কোকো উৎপাদনে সংকট

পশ্চিম আফ্রিকার আইভরি কোস্টে ভেরা তাপঝড়ের প্রভাবে কৃষিকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশটির কোকো উৎপাদনকারী অঞ্চলে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম ও খরা দেখা দেয়। কোকো গাছের জন্য প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেশটির ডিগরিক্রো গ্রামের কৃষক ও স্থানীয় প্রধান ব্রু কুয়াসির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোকো চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে কৃষিকাজ কঠিন হয়ে ওঠে।

বিশ্ববাজারে চকোলেট তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল কোকো। তাই আইভরি কোস্টের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশে আবহাওয়াজনিত ক্ষতি হলে কৃষকের আয় ছাড়াও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

ইউরোপে প্রাণঘাতী গরম ও অবকাঠামোগত ক্ষতি

তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব ইউরোপেও পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জুনে ইউরোপের কয়েকটি শহরে রেকর্ড তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে। ফ্রান্সের বোর্দো, হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট এবং স্পেনের বিলবাও শহরে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। বিলবাওয়ে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

দীর্ঘস্থায়ী গরমের কারণে রেললাইনের ইস্পাত বেঁকে যাওয়ার মতো অবকাঠামোগত সমস্যাও দেখা দেয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহে তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হাসপাতাল ও জরুরি সেবার ওপর চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং বাইরে কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

জলবায়ু পরিবর্তন কেন বাড়াচ্ছে তাপঝড়

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে তাপপ্রবাহের বিস্তার ও তীব্রতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর তাপ আটকে রাখে। এতে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়ে এবং অনেক অঞ্চলে চরম গরমের ঘটনা আরও তীব্র হতে পারে।

প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো পরিস্থিতিও কোনো কোনো সময়ে তাপপ্রবাহকে শক্তিশালী করে। এ সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করে। তবে এল নিনো ও দীর্ঘমেয়াদি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এক বিষয় নয়। এল নিনো সাময়িকভাবে উষ্ণতা বাড়াতে পারে, আর গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপঝড়ের পাশাপাশি শৈত্যপ্রবাহের বিস্তারও কমেছে। ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় চলতি দশকে শীতকালে ঠান্ডা পরিস্থিতির আওতায় থাকা পৃথিবীর গড় এলাকার পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

নতুনভাবে তাপপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ

হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় তাপপ্রবাহকে আলাদাভাবে চিহ্নিত ও নামকরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু যোগাযোগবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক অ্যান্থনি লাইসেরোভিৎসের মতে, কোনো ঘটনাকে নির্দিষ্ট নামে চিহ্নিত করলে মানুষ সেটির অস্তিত্ব ও প্রভাব সহজে বুঝতে পারে।

এ লক্ষ্যে রয়টার্স একটি হিট স্টর্ম ট্র্যাকার চালু করেছে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর কোন অঞ্চলে তাপঝড় বিস্তৃত হচ্ছে, কত দিন স্থায়ী হচ্ছে এবং কোন এলাকাগুলো বেশি প্রভাবিত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে ভেরাকে সবচেয়ে বিস্তৃত তাপঝড় হিসেবে তুলে ধরা হলেও ২০২৬ সালে ‘রাইমুন্ডো’ নামে আরেকটি তাপঝড়ের বিস্তারও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ২৮ আগস্ট রাইমুন্ডোর বিস্তার পৃথিবীর প্রায় ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকায় পৌঁছায়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও এটি সক্রিয় ছিল বলে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এখন শুধু আবহাওয়াজনিত সমস্যা নয়। এটি মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য, অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, আগাম সতর্কতা জোরদার করা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন