ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

কথিত প্রেমিক রাজু গ্রেপ্তার

অভিমান করে বাড়ি ছাড়ে তাজমিন, কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে ধর্ষণ-হত্যা

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮:৪৪, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৪৫, ১২ অক্টোবর ২০২৬

অভিমান করে বাড়ি ছাড়ে তাজমিন, কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে ধর্ষণ-হত্যা

সংগৃহীত

বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর বাড়ি ছাড়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায় সে। পরে কথিত প্রেমিক রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে পৌঁছায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। ৮ অক্টোবর তার মরদেহ উদ্ধারের পর চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ১১ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে আটক করা হয় রাজুকে।

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কক্সবাজারে যাওয়া, সেখানে কথিত প্রেমিক রাজুর সঙ্গে অবস্থান এবং কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর রাজুকেও আটক করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে রাজুর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

যেভাবে বাড়ি ছাড়ে তাজমিন

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে আশ্রয় নেয় তাজমিন।

সেখান থেকে মুঠোফোনে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে সে। পরে রাজু তাকে কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠায়। সেই টাকা পাওয়ার পর তাজমিন কক্সবাজারে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কক্সবাজারে রাজুর সঙ্গে অবস্থান

রাজুকে নিয়ে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থানের তথ্যও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ওঠে তাজমিন ও রাজু। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়ে।

হোটেলের নিবন্ধন খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রাজুর পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সেখানে তাজমিনের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে কক্সবাজারের একটি পরিবহন কাউন্টারের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু পরদিনের যাত্রার জন্য বাসের টিকিট সংগ্রহ করে। পরদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে কুমিল্লাগামী বাসে তুলে দেওয়া হয়।

কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ

কক্সবাজার থেকে বাসে করে কুমিল্লায় ফেরে তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামে সে।

এরপর নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সুমন মিয়ার চালিত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন।

রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। এ সময় অটোরিকশাচালক সম্পর্কেও কথা হয় তাদের। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সুমন তাজমিনকে রেসকোর্সের বাসায় না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাজমিনের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশা রেখে সেখান থেকে চলে যায় সুমন। পরে সে ফোনটি একটি পুকুরপাড়ের ঝোপে লুকিয়ে রাখে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ধানখেতের আইল থেকে মরদেহ উদ্ধার

৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানখেতের আইল থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার বাবা মরদেহ শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়। এরপর থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে।

তদন্তের একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সূত্রের সহায়তায় সুমনকে শনাক্ত করা হয়। ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়।

১০ অক্টোবর কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পংকজ বড়ুয়া জানান, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজার থেকে আটক রাজু

তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অংশ হিসেবে ১১ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে রাজুকে আটক করে পুলিশ। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর যোগাযোগ এবং কক্সবাজারে অবস্থানের বিষয়টি সামনে আসে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে রাজুর সরাসরি জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাজমিন কীভাবে কক্সবাজারে গেল এবং পুরো ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব হবে।

তাজমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন