ঢাকা, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে রায়ে প্রিমিয়ার লিগেরও অস্বস্তি

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৫৩, ১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৩, ১ অক্টোবর ২০২৬

ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে রায়ে প্রিমিয়ার লিগেরও অস্বস্তি

সংগৃহীত

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জয় পেয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। তবে এই রায়ের প্রভাব শুধু সিটির ওপরই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত দেড় দশকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ফুটবল লিগে যে আর্থিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, সেই পুরো সময়কাল নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।

২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০০টির বেশি আর্থিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ম্যানচেস্টার সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। স্বাধীন কমিশনের তদন্তে ক্লাবটির আয় কৃত্রিমভাবে বাড়ানো এবং ব্যয় কম দেখাতে ‘ভুয়া’ চুক্তির ব্যবহার করা হয়েছিল বলে উঠে এসেছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ৯০ কোটি পাউন্ডের বেশি অর্থের হিসাব প্রভাবিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

সিটির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শাস্তি হিসেবে বড় অঙ্কের পয়েন্ট কাটা, যার ফলে অবনমন হতে পারে, অতীতের শিরোপা কেড়ে নেওয়া কিংবা ইংলিশ শীর্ষ লিগ থেকেই বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থার কথা আলোচনায় এসেছে।

তবে এই ঘটনায় ম্যানচেস্টার সিটির পাশাপাশি প্রিমিয়ার লিগের গত ১৮ বছরের ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সিটির উত্থানে বদলে যায় প্রিমিয়ার লিগ

২০০৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মালিকানায় যাওয়ার পর ম্যানচেস্টার সিটির আর্থিক অবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে বদলে যেতে থাকে প্রিমিয়ার লিগের প্রতিযোগিতার চিত্র।

এরই ধারাবাহিকতায় ৪৪ বছর পর ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগের শিরোপা জেতে সিটি। ২০১১-১২ মৌসুমের শেষ ম্যাচে কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের বিপক্ষে যোগ করা সময়ে সার্জিও আগুয়েরোর গোল দলটিকে শিরোপা এনে দেয়। গোলটি একই সঙ্গে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে শিরোপা থেকে বঞ্চিত করে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।

সিটির বিরুদ্ধে রায়ের পর ক্লাবটির প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ডিফেন্ডার রিও ফার্দিনান্দ লিখেছেন, ‘ক্যাবিনেটে যোগ হলো আরেকটি প্রিমিয়ার লিগের পদক।’ ২০১১-১২ মৌসুমে ইউনাইটেডের হয়ে তিনি সিটির পেছনে থেকে লিগ শেষ করেছিলেন।

ইতালির ফুটবলের মতো পরিণতির শঙ্কা

তবে সিটির বিরুদ্ধে রায়ের প্রভাব আরও বড় হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সেরা খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে আসছে। ফলে এই লিগের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

১৯৯০-এর দশকে ইতালির সিরি আ-ও একই ধরনের প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। ২০০৬ সালের ‘ক্যালচোপলি’ কেলেঙ্কারির সময় অবশ্য লিগটি আগের সেই জৌলুস কিছুটা হারিয়েছিল। ওই ঘটনায় ক্লাব কর্মকর্তাদের ম্যাচ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট রেফারি নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। এর পর জুভেন্টাসের দুটি শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয় এবং ক্লাবটিকে সিরি বি-তে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এর দুই দশক পরও ইতালিয়ান ফুটবল পুরোপুরি সেই অবস্থান ফিরে পায়নি বলে মনে করেন অনেকে।

শিরোপাগুলো নিয়েও প্রশ্ন

গত ১৫ মৌসুমে আটবার প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে ম্যানচেস্টার সিটি। এই সময়ে তারা এক মৌসুমে ১০০ পয়েন্ট অর্জন এবং টানা চারবার ইংলিশ শীর্ষ লিগের শিরোপা জয়ের মতো রেকর্ড গড়েছে।

এখন এসব সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড অধিনায়ক রয় কিন বলেছেন, ‘আমি যদি খেলোয়াড় হতাম, তাহলে ওই পদকগুলো ১০০ শতাংশ ডাস্টবিনে ফেলে দিতাম। এটা তো প্রতারণা।’

প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বড় তারকাদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইংলিশ ক্লাবগুলো সবসময় সফল হয়নি। রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ ও প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের মতো ক্লাব এখনো শীর্ষ খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করে।

সিটির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি হলে প্রিমিয়ার লিগ তাদের অন্যতম তারকা আর্লিং হলান্ডকেও হারাতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

আফ্রো-ইউরেশিয়ান স্পোর্টসের অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক এএফপিকে বলেন, প্রিমিয়ার লিগ যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় ‘সফট পাওয়ার সাংস্কৃতিক সম্পদ’। তার প্রশ্ন, মানুষ যদি ভাবতে শুরু করে, ‘আমি এত বছর কী দেখেছি?’ তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?

নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করল প্রিমিয়ার লিগ

তবে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের দাবি, ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই মামলাই তাদের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার প্রমাণ।

২০১৮ সালে তদন্ত শুরু হওয়ার পর সিটি কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বাধা সত্ত্বেও লিগ কর্তৃপক্ষ তদন্ত চালিয়ে গেছে। প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স বলেন, ‘এই শাস্তিমূলক মামলা এবং এর সিদ্ধান্ত প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ক্লাবগুলোর অনুমোদিত নিয়মগুলো কার্যকর করা এবং প্রতিযোগিতার সততা রক্ষা করা প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

মাস্টার্সের ভাষায়, সব ক্লাব ও সমর্থকের জন্য প্রতিযোগিতাকে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দায়িত্বকে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে।

ফলে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে মামলার ফল শুধু একটি ক্লাবের শাস্তির বিষয় হয়ে থাকছে না। এর মাধ্যমে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক কাঠামো, গত দেড় দশকের প্রতিযোগিতা এবং মাঠের সাফল্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন