আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭:৫৯, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সতর্ক করে বলেছেন, এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে একসময় তারাই তালেবান সরকারের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সোমবার পাকিস্তানের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। পাকিস্তানের টেলিভিশনে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
ইসহাক দার বলেন, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কাবুল সফরের সময় তিনি আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে একই বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি তাকে বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম, আফগান কর্তৃপক্ষ তাদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে এমন দিন আসবে, যখন এই গোষ্ঠীগুলোই তার সরকারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
তবে সে সময় আফগান কর্তৃপক্ষ কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, তা প্রকাশ করেননি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান কাবুলের
পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছেন এবং সমস্যার সমাধানের চেয়ে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি লেখেন, ‘নিজেদের ব্যর্থতার জন্য আফগানিস্তানকে দায়ী করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।’
এর জবাবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইসলামাবাদ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে অগ্রগতি নির্ভর করছে কাবুলের সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল ও তাদের সহায়তাকারী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এবং আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখাকে আশ্রয় দিচ্ছে। তবে আফগান তালেবান সরকার পাকিস্তানে হামলাকারী গোষ্ঠীগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।
টিটিপি আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবানের থেকে পৃথক সংগঠন হলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগেও অগ্রগতি নেই, দাবি ইসলামাবাদের
ইসহাক দার বলেন, কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় পক্ষের দায়িত্ব। এর অর্থ এই নয় যে, একের পর এক হামলা নীরবে সহ্য করে যেতে হবে।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে তিনি তিনবার কাবুল সফর করেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে উন্নীত করা এবং আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে রেলপথ নির্মাণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, পাকিস্তান একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ আফগানিস্তান দেখতে চায়। তবে সীমান্তের ওপার থেকে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
ইসহাক দারের অভিযোগ, পাকিস্তানের ভেতরে হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা হয় আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে। পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে হামলাকারীরা পাকিস্তানে প্রবেশ করে সেনাসদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আবার নিজেদের আশ্রয়স্থলে ফিরে যায়।
সীমান্তে বেড়া নির্মাণের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আফগানিস্তানের সঙ্গে ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। সীমান্তের ওপার থেকে জঙ্গি হামলায় পাকিস্তানি সেনাচৌকিগুলো আক্রান্ত হওয়ার পর ২০১৭ সালে এ বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
টিটিপিকে পাকিস্তানের অন্যতম গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে ইসহাক দার বলেন, গোষ্ঠীটি স্কুল, মসজিদ, বাজার ও নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বিএলএর বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে হামলার অভিযোগ করেন তিনি।
পাকিস্তানের দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশটিতে ২ হাজার ৮০০টির বেশি জঙ্গি হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন।
আফগানিস্তানে হাজারো টিটিপি যোদ্ধা থাকার দাবি
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার। তিনি দেশটিতে সহিংসতা বৃদ্ধির জন্য আফগানিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে, বিশেষ করে টিটিপিকে দায়ী করেন।
জাতিসংঘ ও স্বাধীন বিভিন্ন মূল্যায়নের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে টিটিপির ৬ হাজারের বেশি যোদ্ধা রয়েছে। দেশটিতে সব মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য অবস্থান করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তারারের অভিযোগ, ২০২১ সালে আফগান তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে টিটিপি আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে আফগানিস্তানে এসব গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও তাদের কার্যক্রম নিয়ে পাকিস্তান ও তালেবান সরকারের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে বারবার সংঘর্ষ ও পাকিস্তানের বিমান হামলার ঘটনায় দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের আফগানিস্তান সহায়তা মিশন (ইউএনএএমএ) জানিয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমান্তপারের সহিংসতায় আফগানিস্তানে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে।