আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮:১২, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের উত্তেজনা কিছুটা কমে আসার পর এমন বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসে এই বোমার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সামরিক পরিভাষায় জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট নামে পরিচিত বোমাটির ডাকনাম ‘মাদার অব অল বম্বস’। প্রায় ১০ টন ওজনের এই বোমা মূলত ভূপৃষ্ঠের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য তৈরি। তবে এটি দিয়ে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক ইলাইজা মানিয়ে আল জাজিরাকে বলেন, এমওএবি দিয়ে ইরানের মাটির গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসের নিশ্চয়তা নেই। তার মতে, এমন হামলা কার্যকর সামরিক কৌশলের পরিবর্তে রাজনৈতিক চমক প্রদর্শনের উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
বোমাটিতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক রয়েছে। এর মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের বেশি। বিশাল আকারের কারণে এটি সাধারণ যুদ্ধবিমানে বহন করা যায় না। বোমাটি নিক্ষেপের জন্য সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান ব্যবহার করতে হয়।
২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে বোমাটি তৈরি করা হয়। এরপর একাধিক পরীক্ষায় এর সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়াইকে ‘মাদার অব অল ব্যাটলস’ বা ‘সব যুদ্ধের মা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখেই বোমাটির নাম রাখা হয় ‘মাদার অব অল বম্বস’।
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত বাস্তবে মাত্র একবার এই বোমা ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) গুহা ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে এটি নিক্ষেপ করা হয়। সে সময় আফগান কর্তৃপক্ষ ৯৪ জন জঙ্গি নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় কোনো বেসামরিক মানুষ হতাহত হননি। তবে স্থানীয়ভাবে বাড়িঘর ধ্বংস এবং বেসামরিক নাগরিক হতাহতের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যও সামনে এসেছিল।
এমওএবি মাটিতে আঘাত করার আগেই ভূপৃষ্ঠের কিছুটা ওপরে বিস্ফোরিত হয়। এতে ব্যাপক অগ্নিশিখা ও শক্তিশালী অভিঘাত তরঙ্গ তৈরি হয়, যা আশপাশের ভবন, সামরিক স্থাপনা এবং গুহা বা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষক কর্নেল নিদাল আবু জায়েদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই বোমা ব্যবহার করে ইরানের ভূপৃষ্ঠে থাকা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস এবং পাহাড়ের নিচে অবস্থিত স্থাপনাগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।
তবে বোমাটির কার্যকারিতা নির্ভর করে ভূপ্রকৃতি, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান ও আশপাশের পরিবেশের ওপর। উন্মুক্ত স্থানে থাকা সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এটি ভয়াবহ ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ইরানের ফোরদো পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নির্মাণাধীন ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গভীরে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনা ধ্বংস করতে এমওএবি যথেষ্ট কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি)। প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের এই বাংকার বিধ্বংসী বোমা অত্যন্ত শক্ত ইস্পাত দিয়ে তৈরি। এটি বিস্ফোরণের আগে মাটি বা পাথরের প্রায় ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে, এমওএবি মূলত ভূপৃষ্ঠে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অস্ত্র, গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসের জন্য তৈরি নয়।
এমওএবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বোমাটি বহন করতে সি-১৩০ পরিবহন বিমান প্রয়োজন হওয়ায় সেটিকে ইরানের আকাশসীমার কাছাকাছি নেওয়া কঠিন হতে পারে। ধীরগতির এই বিমানকে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছাতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কিছু সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা গেলেও তা দেশটির সরকারকে রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং হামলাটি সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন আলোচনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প চলমান সংঘাতের এমন একটি চূড়ান্ত পরিণতি চাইছেন, যা ওয়াশিংটনকে পরাজিত নয়, বরং বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরবে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে এমওএবি ব্যবহারের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।