এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮:৩২, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৩৩, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, তা পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার ফল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভঙ্গুর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক পরিসরে গালফ ওয়ারের মতো সংকট দেখা দেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। তারপরও দেশের কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি।
পরবর্তী সময়ে সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করতে সরকার বাধ্য হয়েছে বলে জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বাড়তি কোনো কর আরোপ না করে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছে সরকার।
তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা
দেশের এলএনজি ঘাটতি মেটানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন সময়সাপেক্ষ হলেও বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপে বিশ্বাসী।
তিনি বলেন, মাতারবাড়ীতে চীন সরকারের সঙ্গে ‘জি টু জি’ চুক্তির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে একটি ভূমিনির্ভর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এসব প্রকল্প থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শত শত কিলোমিটার উন্নত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
বড়পুকুরিয়ায় ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশীয় কয়লা ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কয়লার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ চলছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধের বিধিনিষেধের মধ্যেও ২০২১ সালের আগের চুক্তির আওতায় পায়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরু করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সরকারের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সঞ্চালন ও গ্রিড লাইনের সংকট দেখা দিলে সরকার নিজস্ব জিওবি তহবিল থেকে অর্থায়ন করে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন নির্মাণ করবে বলেও জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলপিজি ব্যবহারে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান করা হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগ—দুই জায়গাতেই কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে।
ইতোমধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ সচল করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে পাওয়া গ্যাসকে কেন্দ্র করে সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি দেশের এলপিজির চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়ীতে একটি বড় এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস খালাস করা যায়, সে জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাসমান সিবিএস প্রযুক্তির টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘ছয় মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তন’
বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সময়সীমার প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সরকার যখন ভঙ্গুর আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, তখন সবকিছু রাতারাতি পরিবর্তন করা কঠিন। তবে প্রধানমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তনের যে মহাপরিকল্পনা বা ‘আই হ্যাভ প্ল্যান’ নীতি গ্রহণ করেছেন, তা ইতোমধ্যে কার্যকর হতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমানো নয়; কয়লা, বায়ু, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে দুর্যোগসহনশীল ও টেকসই জ্বালানি খাত গড়ে তোলা।
এর মাধ্যমে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে এবং কোনো শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিটি সমস্যার টেকসই সমাধানে কাজ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের উত্তরণ সম্ভব হবে।