এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:০৮, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৯:০৯, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাঁর এক বছরের নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এর মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর আবারও কোনো বাংলাদেশি পাচ্ছেন জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল বহুপক্ষীয় ফোরাম পরিচালনার দায়িত্ব।
এই দায়িত্ব শুধু একজন বাংলাদেশি কূটনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বাংলাদেশের জন্যও এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে একটি বড় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাধারণ পরিষদের আলোচনায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য, যুদ্ধ, সংঘাত ও বৈশ্বিক নানা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। সেই বিশাল ফোরামের অধিবেশন পরিচালনা করবেন বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি এটি দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ড. খলিলুর রহমান জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন। ৮১তম অধিবেশনের কার্যক্রম চলবে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ।’
ভোটে ঐতিহাসিক জয়
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটে জয় পান ড. খলিলুর রহমান। গোপন ভোটে তিনি পেয়েছেন ৯৯ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়ে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি সংস্থাটির পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বণ্টিত হয়। এবার সভাপতির পদের জন্য সুযোগ ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের। এই অঞ্চলের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ ড. খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়। শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিশ্চিত করেন।
কূটনৈতিক মহলে এই জয়কে বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয়, মতপার্থক্য নিরসন এবং জটিল বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
চার দশক পর আবার বাংলাদেশি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়, তবে দীর্ঘদিনের ব্যবধানের কারণে এবারের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে বাংলাদেশের কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। এরপর প্রায় চার দশক পেরিয়ে আবারও কোনো বাংলাদেশি এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর ড. খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জাতিসংঘ কূটনীতিতে ধারাবাহিকতারও প্রতীক। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত হয়েছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, অভিবাসন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়াকে সেই দীর্ঘ কূটনৈতিক সম্পৃক্ততারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল বহুপক্ষীয় ফোরাম। নিরাপত্তা পরিষদের মতো এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমিত সংখ্যক দেশ নয়, জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের ভোটের অধিকার সমান।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি সাধারণত বিভিন্ন অধিবেশন পরিচালনা, আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণ, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বক্তব্য ও মতামত সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে এই পদে থেকে কোনো দেশের জাতীয় স্বার্থ সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ সীমিত; বরং সভাপতিকে নিরপেক্ষতা, ভারসাম্য ও ঐকমত্য তৈরির ভূমিকা পালন করতে হয়।
এ কারণে ড. খলিলুর রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত, মানবিক সংকট, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এই দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক সংকটের সময়ে নেতৃত্ব
৮১তম সাধারণ অধিবেশন এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন বিশ্বব্যবস্থা নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত, শরণার্থী সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এমন বাস্তবতায় এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রশ্ন এবারের অধিবেশনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে যখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করা সাধারণ পরিষদের সভাপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে।
গুতেরেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ
দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ড. খলিলুর রহমান। এই সাক্ষাৎ তাঁর নতুন দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মধ্যে সমন্বয় সংস্থাটির কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন অধিবেশনে সাধারণ পরিষদের অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে তাঁদের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের কার্যালয় এক বার্তায় ড. খলিলুর রহমানকে তাঁর নতুন বৈশ্বিক নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ উপলক্ষে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের কূটনৈতিক সক্ষমতা তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও সভাপতি হিসেবে তাঁকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে, তবু তাঁর নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ পাবে।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অভিবাসন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, শান্তিরক্ষা এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে কথা বলে আসছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থেকে এসব বিষয়ে বৈশ্বিক আলোচনার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সামনে বড় পরীক্ষা
তবে এই দায়িত্বের সঙ্গে প্রত্যাশার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে একই সঙ্গে বড় শক্তিধর রাষ্ট্র, আঞ্চলিক জোট, উন্নয়নশীল দেশ এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়। অনেক সময় আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান এতটাই বিপরীতমুখী হয় যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ক্ষেত্রে ড. খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক দক্ষতা, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার সক্ষমতা এবং নিরপেক্ষভাবে সভা পরিচালনার যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত ও উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে কঠিন ও স্পর্শকাতর বহু ইস্যু সামনে আসতে পারে। এসব বিষয়ে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ চালু রাখা হবে সভাপতির অন্যতম বড় পরীক্ষা।
নজর বাংলাদেশের দিকে
বাংলাদেশের কূটনীতির ইতিহাসে আজকের দিনটি তাই বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রায় ৪০ বছর পর একজন বাংলাদেশি আবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসছেন। এটি যেমন বাংলাদেশের জন্য গৌরবের, তেমনি দায়িত্বেরও।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী এই বিশাল ফোরামের নেতৃত্বে আগামী এক বছর ড. খলিলুর রহমান কীভাবে বৈশ্বিক সংকট, মতপার্থক্য ও পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করেন, সেদিকেই থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের নজর।
বাংলাদেশের কূটনীতির জন্যও এটি একটি পরীক্ষার সময়। কারণ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন কেবল মর্যাদার নয়, এটি নেতৃত্ব, সমন্বয় ও আস্থা তৈরির একটি বড় মঞ্চ। সেই মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধির সফলতা বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে দেশের ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আজ নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের পর্দা উঠবে। আর সেই মঞ্চের কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকবেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান। প্রায় চার দশকের ব্যবধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবারও বাংলাদেশের উপস্থিতি দেশের কূটনীতিতে সত্যিই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা।