ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

১৮ কার্তিক ১৪৩৩, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান জটিলতা

মার খেয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের পেটালেন রাকসুর জিএস আম্মার

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২২:৪৭, ২৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৭, ২৮ জুলাই ২০২৬

মার খেয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের পেটালেন রাকসুর জিএস আম্মার

ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পরে ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে পেটানোর দাবি করেছেন রাকসুর জিএস আম্মার।

সংবাদমাধ্যম বলছে, ছাত্রলীগের কর্মীর নারী সংক্রান্ত জটিলতা থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়। সেখান থেকে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় সন্দেভাজন ছাত্রলীগের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস ও মাহমুদুল হাসান।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে করা একটি মামলায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তারা দুইজন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলে উপস্থিতি তদন্তে প্রাপ্ত আসামি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তারা দুজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

যেভাবে হামলা-পাল্টা হামলার সূত্রপাত

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার (২৬ জুলাই) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জেরে একই বিভাগের ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো ও ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গত রোববার রাতে ওই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। 

অভিযোগের পর প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তাঁর কার্যালয়ে অভিযুক্তকে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান, যাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ঐ ছাত্রীর অভিযোগ অস্বীকারের একপর্যায়ে কথিত ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রক্টরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে শুরু করেন। এ নিয়ে সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিয়ে প্রক্টর দফতরে আবার বৈঠক হয়। 

প্রক্টর দফতরের বৈঠকে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা উপস্থিত হন। তখন আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা। এ সময় আনাসের মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখার পর তাকে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা হয়।

মার খাওয়ার জেরে ঐ ছাত্রলীগের কর্মী তার আরো সহযোগীদের নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে গিয়ে রাকসু নেতাদের ওপরে হামলার অভিযোগ ওঠে। তবে, এই ঘটনার পরে রাকসু ভবন থেকে ধাওয়া খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নেন কথিত ছাত্রলীগের কর্মীরা। পরে, তাদের ওপরে রাকসু ও শাখা শিবিরের নেতারা হামলা করে বলে অভিযোগ করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। এই ঘটনায় আনাস ও মাহমুদুলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিলে উপাচার্যের দফতর ঘেরাও করে অবস্থান নেয় শিবিরের নেতাকর্মীরা।+

নারী ঘটিত বিষয় ও পাল্টা-পাল্টি হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নারীঘটিত বিষয় ও মারধরের ঘটনা তদন্ত করতে মঙ্গলবার একটি ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। ১০ কার্যদিবসের ভেতরে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তদন্ত কমিটিকে। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম-২ কে আহ্বায়ক করে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছাদিক, ম্যাটেরিয়ালস্ সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাদুল হক, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম এবং ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এ নাঈম ফারুকী। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় গঠিত তদন্ত কমিটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষ পরিদর্শন করে।

ছাত্রলীগ কর্মীদের পাশে ছাত্রদল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট

ছাত্রলীগ কর্মীদের সাধারণ শিক্ষার্থী আখ্যা দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। ছাত্রদল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট রাকসু ও শিবিরের হামলাকে `মব’ আখ্যা দিয়েছে।

মারধরের ঘটনায় রাকসু ও শিবিরের নেতাদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘লাইব্রেরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ জায়গা। অথচ সেখানেই শিবিরে সন্ত্রাসীরা আজ হামলা করেছে। সেই হামলায় আবার তারাই ‘গুপ্ত শিবির’ যারা আগে ছাত্রলীগ করত, তাদের সঙ্গে নিয়ে হামলা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রক্টরের, অথচ সেই প্রক্টর দফতরেই তাদের উপর প্রথমে হামলা করা হয়েছে। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে এভাবে ‘মব’ করে কোনো মোনাফেক সংগঠন কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রক্টরের উপস্থিতিতে তিন ব্যক্তিকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না করে, পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ স্থান কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে যেভাবে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে পেটানো হয়েছে, তা কোনো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের চিত্র হতে পারে না। এই বর্বরোচিত ঘটনার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

কোনো অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কোনো ছাত্র সংগঠনের নেই উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীরা যে স্বাধীন ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিল, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতি সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। 

এ ঘটনায় তারা দুইটি দাবি জানিয়েছেন- ১. ছাত্রলীগ কর্তৃক রাকসু ভবনে হামলার তদন্ত ও বিচার একইসাথে মব ভায়োলেন্সের সাথে জড়িত রাকসু ও শিবিরের দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে,

২. সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ পুরো ক্যাম্পাসে পড়াশোনার স্বাভাবিক ও ভীত্তিহীন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

ছাত্রী উত্ত্যক্তের বিষয় এড়িয়ে গেলো ছাত্রদল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট

সকল ঘটনার সূত্রপাতের মূল ছিল ছাত্রলীগের সহযোগী নুরে আলমের বিরুদ্ধে একই বিভাগের ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ও ছাত্রীকে ভয় দেখানো এবং ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি। তবে, ছাত্র সংগঠন দুটি ছাত্রীর বিচার চেয়ে কোনো বিক্ষোভ কিংবা অন্য কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। ছাত্রদল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট শুধুমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ও শিবিরের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে তাদের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি বা বক্তব্যে ছাত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনো নিন্দা পর্যন্ত দেখা যায়নি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন