ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

বড় ঋণ খেলাপিরা কেন শাস্তি পায় না?

ছোট ঋণগ্রহীতার কিস্তি একটু দেরি হলেই নোটিশ-মামলা, বড় খেলাপিদের জন্য বারবার নীতি সুবিধা ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে প্রশ্ন

বিবিসি

প্রকাশ: ১০:২৬, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বড় ঋণ খেলাপিরা কেন শাস্তি পায় না?

ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার পর কিস্তি দিতে সামান্য দেরি হলেই গ্রাহকের মুঠোফোনে এসএমএস, বাড়িতে নোটিশ, এমনকি মামলা পর্যন্ত হতে পারে। অথচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর তা পরিশোধ না করা বড় ঋণখেলাপিদের অনেকেই পাচ্ছেন পুনঃতফসিল, নবায়নসহ নানা নীতি সুবিধা। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাত নিয়ে আলোচনায় এমন বৈপরীত্যের অভিযোগ নতুন নয়।

ধাপে ধাপে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে। ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১ হাজার কোটি টাকায়। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ এক দশকের বেশি সময়ে খেলাপি ঋণের বোঝা কয়েক গুণ বেড়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আবারও নীতি সহায়তা ও ছাড়ের পথ বেছে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, মামলা করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার চেয়ে সমঝোতা ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপিদের কাছ থেকে দ্রুত অর্থ আদায় করা গেলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পাশাপাশি শিল্পকারখানা সচল থাকলে কর্মসংস্থানও রক্ষা পাবে।

তবে প্রশ্ন উঠছে—বারবার ছাড় দিয়ে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে আদৌ কতটা অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব? নাকি এতে ভালো ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতাই আরও বাড়বে?

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ?

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই ও তদারকি, ব্যাংক পরিচালকদের প্রভাব, নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহির ঘাটতি।

গত দুই দশকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পর তা ফেরত না দিয়ে পুনঃতফসিল বা অন্যান্য নীতি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু অনেক দুর্বল ব্যাংক পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। এতে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ঋণ বিতরণের সময় কঠোর যাচাই ও পরবর্তী সময়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

বড় খেলাপিরা কেন সহজে শাস্তির মুখে পড়েন না?

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে অর্থ আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে সাত বছর বা তারও বেশি সময় ধরে মামলা চলার অভিযোগ রয়েছে।

ফলে ব্যাংকগুলোর একটি অংশ মামলা করতে অনাগ্রহী থাকে। কারণ মামলা হলে দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে চাপ তৈরি করে। অন্যদিকে বড় ঋণখেলাপিদের অনেকেরই শক্তিশালী আইনজীবী ও দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো—বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রপ্তানি জড়িত। ফলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিক ছাঁটাই, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় সরকার ও ব্যাংক অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার নীতি নেয়।

এর সুযোগে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের পথ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চললেও কার্যকর অর্থ আদায় হয় না।

‘উইলফুল ডিফল্টার’ নিয়ে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে যেতে পারেনি।

তার ভাষায়, বিদ্যমান আইনে ‘উইলফুল ডিফল্টার’ বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এখনো যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা—এই দুই শ্রেণিকে আলাদা করে দেখা জরুরি। একই ধরনের সুবিধা উভয় শ্রেণিকে দেওয়া হলে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিদেশে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ঋণখেলাপিদের নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ও ক্রেডিট রেকর্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। খেলাপি হলে ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভারতে বড় করপোরেট খেলাপিদের ক্ষেত্রে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোডের আওতায় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পাওনা উদ্ধারের ব্যবস্থা রয়েছে। চীনেও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশেও অর্থঋণ আদালতসহ আইনি কাঠামো রয়েছে। তবে আইন থাকলেও তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে কি না—এ নিয়েই মূল প্রশ্ন।

নতুন করে বড় খেলাপিদের ছাড়

গত ৩১ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সেখানে এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধে সর্বোচ্চ ১৫ বছর সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি দিতে হবে না—এমন সুযোগও রাখা হয়েছে।

এই সুবিধা নিতে আগ্রহী ঋণগ্রহীতাদের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরও বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে নীতি সহায়তা দিয়েছিল। সেখানে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের স্থিতির ওপর কমপক্ষে ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছিল। ঋণ নিয়মিত হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর সময় দেওয়ার কথা জানানো হয়।

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণাও এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি কী?

বড় খেলাপিদের দেওয়া নতুন সুবিধার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।

এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারভিত্তিক সুদের হার বাড়ায় ব্যবসায়ীদের সুদ ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে বিক্রি ও আয় কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ মাসের রোডম্যাপের অংশ হিসেবেও বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো, একটি ঋণ নিয়ে ১০ বছর মামলা চালানোর পরও যদি অর্থ আদায় না হয়, তার চেয়ে সমঝোতার মাধ্যমে এখনই উল্লেখযোগ্য অংশের অর্থ আদায় করা বেশি কার্যকর হতে পারে। এতে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে এবং ঋণগ্রহীতার শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল থাকলে কর্মসংস্থানও রক্ষা পাবে।

ছাড় নিয়ে সমালোচনা

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নীতি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হলেও প্রকৃত অর্থে ব্যাংকের হিসাবে কত টাকা ফিরে আসছে, সেটিই মূল বিষয়।

বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হলে ভালো ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে অন্যায় বৈষম্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণ না দিলেও চলে—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এসব সুবিধার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো খেলাপি আরও খেলাপির দিকে যেতে পারেন। তাই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ব্যাংক পরিচালনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য শুধু ছাড় বা শাস্তি—কোনোটিকেই একক সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজন হবে একই সঙ্গে সংস্কার, কঠোর তদারকি এবং দ্রুত অর্থ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা।

প্রথমত, ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ঋণ নেওয়ার পর অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে পরিচালকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে। ব্যবসায়িক সংকটে পড়া প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্থ ফেরত না দেওয়া ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, অর্থঋণ আদালতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা চললে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে এবং ঋণগ্রহীতারাও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পান।

পঞ্চমত, ঋণখেলাপিদের নতুন করে ঋণ নেওয়া, সম্পদ হস্তান্তর কিংবা নতুন ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর বিধিনিষেধের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ছয় লাখ কোটি থেকে আট লাখ কোটি?

বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীবের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংস্কৃতি ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাঁর আশঙ্কা, নীতি সুবিধা দেওয়া হলেও তা যেন ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা অপব্যবহার করতে না পারেন।

তার মতে, বর্তমান সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। যারা এসব সুবিধা পাওয়ার পরও ঋণের অর্থ ফেরত দেবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, পুরো প্রক্রিয়ার সফলতা অনেকাংশে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপমুক্তভাবে কাজ করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কঠিন হবে।

বাস্তবতা হলো, খেলাপি ঋণ এখন শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। একদিকে দুর্বল ব্যাংকের মূলধন ও তারল্যের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ আমানতকারী ও ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে।

তাই বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে ‘ছাড়’ নাকি ‘শাস্তি’—এই দ্বৈততার বাইরে গিয়ে প্রয়োজন একটি স্পষ্ট নীতি। যারা বাস্তব ব্যবসায়িক সংকটে পড়েছেন, তাদের পুনর্গঠনের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে নীতি সুবিধাই উল্টো পুরস্কারে পরিণত হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা এখনই না নেওয়া হলে কয়েক লাখ কোটি টাকার এই বোঝা আরও বাড়বে। ছয় লাখ কোটি টাকা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, ভবিষ্যতে তা আট লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে খুব বেশি সময় নাও লাগতে পারে।

অতএব, ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করতে শুধু নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিল নয় প্রয়োজন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি। কারণ ঋণখেলাপির সংস্কৃতি ভাঙা না গেলে ব্যাংকিং খাতের সংকটও স্থায়ীভাবে কাটবে না।

আরও পড়ুন