বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:২৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৪, ৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রয়াত বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকর।সংগৃহীত
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সকালে বাসভবনে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় নানা পাটেকাকে। পরে দ্রুত তাঁকে গোয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসক শেখর সালকার জানিয়েছেন, নানা পাটেকরকে হাসপাতালে আনার পর দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নানা পাটেকর ছিলেন হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রের অন্যতম স্বতন্ত্র অভিনেতা। শক্তিশালী সংলাপ উপস্থাপন, তীব্র অভিব্যক্তি এবং জটিল চরিত্রকে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতার কারণে তিনি আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর ধীরে ধীরে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ১৯৮৬ সালের ‘অঙ্কুশ’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘ওয়াজুদ’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’ ও ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন।
বিশেষ করে ‘পরিন্দা’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ‘ক্রান্তিবীর’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর দাপুটে অভিনয় তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। অভিনয়ের পাশাপাশি ১৯৯১ সালে ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন।
গম্ভীর ও শক্তিশালী চরিত্রের জন্য পরিচিত হলেও নানা পাটেকার কমেডিতেও নিজের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ২০০৭ সালের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ওয়েলকাম’-এ গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
চরিত্রটির সংলাপ, অভিনয়ভঙ্গি ও অনন্য হাস্যরস তাঁকে বলিউডের বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শকদের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে। পরে ২০১৫ সালের ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ সিনেমাতেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। হিন্দি ও মারাঠি দুই ভাষার চলচ্চিত্রেই তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। শক্তিশালী অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক বিষয়েও তাঁর অবস্থান তাঁকে চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, ৪ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নানা পাটেকর। সেখানে তিনি বক্তব্যও দেন। অনুষ্ঠানের ভিডিও মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে সাদা কুর্তা ও পায়জামায় দেখা যায়।
জীবনের শেষ পর্যায়েও অভিনয় থেকে সরে যাননি এই অভিনেতা। ২০২৫ সালে তাঁকে ‘হাউসফুল ৫’-এ দেখা যায়। ২০২৬ সালেও ‘সুবেদার’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ দর্শকদের সামনে এসেছে।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোক নেমে এসেছে। দেশটির শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন, উল্লেখযোগ্য চরিত্র ও চলচ্চিত্রের কথা তুলে ধরেছে। ভারতের বাইরেও নেপাল ও অন্যান্য অঞ্চলের সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছে।
চার দশকের বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করে নানা পাটেকার এমন এক অভিনয়শৈলী তৈরি করেছিলেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো খলনায়ক, কখনো রাজনৈতিক চরিত্র, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টার, নানা ধরনের চরিত্রে তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন।
তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন ও চরিত্রের আবেগকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা। এ কারণে তাঁর অভিনীত বহু চরিত্র সিনেমা শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে দীর্ঘদিন থেকে গেছে।
নানা পাটেকরের মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটাল। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র ও স্মরণীয় চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের কাছে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।