ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

সালমান শাহকে হারানোর ৩০ বছর, আজও দর্শকের হৃদয়ে অমর নায়ক

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২:২০, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সালমান শাহকে হারানোর ৩০ বছর, আজও দর্শকের হৃদয়ে অমর নায়ক

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের নাম সালমান শাহ। স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই তিনি জয় করে নিয়েছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজস্ব ফ্যাশন ও স্টাইল দিয়ে নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন এই জনপ্রিয় অভিনেতা। ঢালিউডের অমর নায়ক হিসেবেও আজও তিনি দর্শকের কাছে সমানভাবে স্মরণীয়।

অকালপ্রয়াণের তিন দশক পরও সালমান শাহকে ঘিরে দর্শকের ভালোবাসায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের নস্টালজিয়ার অন্যতম প্রতীক। তাঁর সিনেমা মানেই নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিকতা, তারুণ্যের আবেগ এবং দর্শকের ভালোবাসায় ভরা এক স্বর্ণালি অধ্যায়।

আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সালমান শাহকে হারানোর ৩০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৬ সালের এই দিনে মাত্র ২৫ বছর বয়সে অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।

মৃত্যুবার্ষিকী এলেই সিলেট শহরের দাড়িয়াপাড়ায় সালমান শাহর নানার বাড়িতে ভক্তদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এই বাড়িতেই তাঁর শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে। বর্তমানে বাড়িটি ‘সালমান শাহ হাউজ’ নামে পরিচিত।

সালমান শাহর মামা কুমকুম জানান, শৈশবের দুরন্ত সময়ের অনেকটাই এই বাড়িতে কেটেছে তাঁর। মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহর জনপ্রিয়তা যে এতটুকু কমেনি, সেটিও স্পষ্ট হয় দর্শকের আগ্রহে। এখনো টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত সিনেমা প্রচার হলে দর্শক আগ্রহ নিয়ে তা দেখেন। তাঁর সিনেমার গান প্রচার হলেও দর্শকের আগ্রহ থাকে সমান।

অনেক সময় একই সময়ে একটি চ্যানেলে নতুন সিনেমা এবং অন্য চ্যানেলে সালমান শাহর পুরোনো সিনেমা প্রচার হলেও দর্শকের বড় একটি অংশ সালমানের সিনেমাটিই বেছে নেন। তাঁর অভিনয়, পর্দার উপস্থিতি ও ফ্যাশন এখনো দর্শকের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে।

শৈশব থেকেই অভিনয় ও সংগীতের প্রতি আগ্রহ

সালমান শাহর জন্ম ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। সিলেট শহরের শেখঘাটে তাঁর দাদার বাড়ি এবং দাড়িয়াপাড়ায় নানার বাড়ি।

তাঁর নানা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ অভিনয় করেছিলেন। পারিবারিকভাবেই অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়।

স্কুলজীবনেই সংগীতশিল্পী হিসেবে বন্ধুদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন সালমান শাহ। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লিগীতিতে প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

চলচ্চিত্রে আসার আগেই ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরা হকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সালমান শাহ।

নাটক দিয়ে অভিনয়জীবনের শুরু

সালমান শাহ চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠলেও তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু নাটক দিয়ে। মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘পাথর সময়’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়।

নাটকটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তৌকীর আহমেদ। তবে সালমান শাহর চরিত্রটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করে প্রশংসা পান তিনি।

তবে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পরই তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে নতুন অধ্যায়

সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। এতে তাঁর সঙ্গে অভিনয় করেন মৌসুমী। প্রথম সিনেমাতেই দর্শকের ব্যাপক সাড়া পান তিনি।

মৌসুমীর সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ‘স্নেহ’ ও ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমাতেও অভিনয় করেন সালমান শাহ। তবে তাঁদের জুটি আর দীর্ঘ হয়নি।

অন্যদিকে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি হিসেবে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। শাবনূরের সঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ। তাঁদের রোমান্টিক জুটি নব্বইয়ের দশকের দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

সালমান শাহ আরও অভিনয় করেছেন শাবনাজ, শাহনাজ, লিমা, শিল্পী, শ্যামা, সোনিয়া, বৃষ্টি, সাবরিনা ও কাঞ্চির সঙ্গে।

‘ধূমকেতুর মতো’ এসেছিলেন, রেখে গেছেন অমর স্মৃতি

সালমান শাহর চলচ্চিত্রজীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে এমন প্রভাব তৈরি করেন, যা এখনো অমলিন।

অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক, চুলের স্টাইল ও ফ্যাশনে তিনি নব্বইয়ের দশকের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন। তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, পোশাক ও গান সবকিছুই তখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিল।

তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা চলচ্চিত্রে অনেক নায়কের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশনের সমন্বয়ে সালমান শাহ যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি এমনটাই মনে করেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকেই।

প্রযোজক-পরিচালকদের অনেকে তাঁকে তুলনা করেন ধূমকেতুর সঙ্গে—হঠাৎ এলেন, দর্শকের হৃদয় জয় করলেন, তারপর অকালেই চলে গেলেন।

তিন দশক পরও সালমান শাহর সিনেমা, গান ও অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আগ্রহের বিষয়। তাঁর মৃত্যুর সময় যারা শিশু ছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছেও সালমান শাহ আজ শৈশবের স্মৃতির অংশ।

সময়ের ব্যবধানে প্রজন্ম বদলেছে, চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু সালমান শাহর প্রতি দর্শকের ভালোবাসা বদলায়নি। তাই তিন দশক পরও তিনি শুধু একজন প্রয়াত নায়ক নন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অমর অধ্যায়ের নাম।

আরও পড়ুন