এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮:১৩, ৩ নভেম্বর ২০২৬
সংগৃহীত
তদন্তে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফের মৃত্যুর আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহে একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। বিশেষ করে, তিনি কীভাবে নদীতে পড়লেন, তাঁর মৃত্যুর পেছনে মাদক সেবন বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না এবং ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা কী জানেন, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
তাহসিফ কে ছিলেন, কেন তাঁকে নিয়ে আলোচনা?
কে এম তাহসিফ সাউরি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। তাঁর বয়স বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ২৭ ও ২৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তাহসিফ ছিলেন বড়। তিনি অবিবাহিত ছিলেন।
২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে বিমান বাহিনীর চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কথা জানানো হয়। তাঁর বাবা জানিয়েছিলেন, শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকরি হারিয়েছিলেন ছেলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাহসিফ ওই ভিডিও ধারণ বা প্রথম সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন বলে আলোচনা ছিল। এ কারণে তাঁর চাকরি চলে যায় কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর চাকরিচ্যুতির সঙ্গে ওই ভিডিওর সম্পর্ক ছিল, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
২৭ অক্টোবর: বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হন
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।
পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সেদিন দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। বাবার জন্যও কিছু জিনিস কিনেছিলেন। সন্ধ্যার পর তাঁর জুনিয়র ও বন্ধুস্থানীয় আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বাসার নিচে আসেন।
দীপের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন বলে মাকে জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ।
বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে তাহসিফ ও দীপ পৃথক মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রাতে তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর মা বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
এদিকে দীপ পরে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, রাতে তাহসিফের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে তাঁকে বাসার কাছাকাছি রেখে তিনি ফিরে এসেছেন। তখনও পরিবারের কাছে তাহসিফের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য ছিল না।
উত্তরার নেস্ট বার: তাহসিফ, দীপ ও এক তরুণী
তদন্তে পরবর্তী সময়ে জানা যায়, সেদিন তাহসিফ ও দীপ উত্তরার একটি বারে গিয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন নিশাত তাসনিম দিশা নামের এক তরুণী।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি বারে অবস্থান করেন। সেখানে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীর মনোমালিন্য হয়।
দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ওই তরুণীর সঙ্গে অন্য এক যুবকের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জানতে পেরে তাহসিফ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। দীপ দাবি করেন, ওই যুবকের বাসায় গিয়ে তরুণী ইয়াবা সেবন করেছিলেন এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।
এ বিষয় নিয়ে বারে তাহসিফ ও ওই তরুণীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় ঘণ্টা তাঁরা সেখানে ছিলেন এবং মদ পান করেন। একপর্যায়ে তাহসিফ ওই তরুণীকে বলেন, তিনি ইয়াবার চেয়েও বড় মাদক হেরোইন সেবন করবেন।
এরপর তিনজন বার থেকে বেরিয়ে আসেন। তাহসিফ মোটরসাইকেলে ওই তরুণীকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান।
তবে বারে ঠিক কী ঘটেছিল, তাঁদের মধ্যে বিরোধের প্রকৃত কারণ কী এবং পরবর্তী সময়ে কে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করতে ৩ নভেম্বরও দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌ পুলিশ। এসব অভিযোগ ও বক্তব্য এখনো তদন্তাধীন।
টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাত্রা
তরুণীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে রওনা হন।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে পৌঁছে তাঁরা বস্তির কাছের একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে গলি দিয়ে মাঠের দিকে যান।
মাঠটি তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ সেখানে হেরোইন কেনেন ও সেবন করেন। এর আগে বারে মদ্যপান করার কারণে তিনি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেও দাবি করেন দীপ।
তবে তাহসিফ সত্যিই মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা এখনো পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিত নয়।
পুলিশের উপস্থিতি ও দুই বন্ধুর আলাদা হয়ে যাওয়া
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রহস্যজনক অংশ এটি।
দীপের দাবি, মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে থাকার সময় পুলিশের পোশাক পরা দুই সদস্যকে দেখতে পান তাঁরা। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুজন দুই দিকে দৌড় দেন।
দীপ তুরাগ নদীর তীরে বিআইডব্লিউটিএর একটি পিলারের কাছে গিয়ে লুকান। তাঁর দাবি, পিলারের আড়ালে দুই থেকে তিন মিনিট থাকার পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরেন।
তাঁর নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চান পুলিশ সদস্যরা। দীপ জানান, তিনি মোহাম্মদপুরে থাকেন এবং তাহসিফের সঙ্গে একটি কাজে সেখানে এসেছেন। পরে পুলিশ তাঁকে চলে যেতে বলে।
দীপের দাবি, এরপর তাহসিফের সঙ্গে তাঁর আর দেখা হয়নি।
তবে এ বিষয়ে তদন্তে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। ওই রাতে মাজার বস্তি এলাকায় আট সদস্যের একটি পুলিশ টহল দল দায়িত্ব পালন করছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই দলের কোনো সদস্যের ভূমিকা বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে নৌ পুলিশ।
এখন পর্যন্ত পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
রাত ১টা ২০ মিনিট থেকে ১টা ৩৯ মিনিট: সিসিটিভি ও ভয়েস মেসেজে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য অনুসন্ধানে সময়ের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো হলো:
সময় কী ঘটেছিল
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাত ১টা ২০ মিনিটে দীপ যদি মাঠ থেকে একা বের হয়ে থাকেন, তাহলে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ কোথায় ছিলেন?
তিনি কি তখনো মাঠের আশপাশে ছিলেন, নাকি অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলেন? মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠানোর সময় তিনি কি নিরাপদ অবস্থায় ছিলেন? আর তার পর কী ঘটেছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে, দীপের দাবি অনুযায়ী পুলিশের উপস্থিতিতে দুজন আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কিন্তু তাহসিফের শেষ ভয়েস মেসেজ প্রমাণ করে, রাত ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত তাঁর ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল।
তিন নারীর নিষেধ ও মাঠের সিসিটিভি ফুটেজ
মাজার বস্তি এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেল রেখে একটি গলি দিয়ে তুরাগ নদসংলগ্ন মাঠের দিকে যাচ্ছেন। এ সময় তিন নারী তাঁদের যেতে নিষেধ করেন।
তাঁরা বলেন, ‘এই, তোমরা চলে যাও।’
তখন তাহসিফ ইংরেজিতে দীপকে বলেন, ‘বেশি কথা বলো না, হাঁটো।’
এই কথোপকথন ঘটনার আগে তাঁদের সেখানে যাওয়ার পরিস্থিতি এবং ওই এলাকার পরিবেশ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে ওই তিন নারী কেন তাঁদের চলে যেতে বলেছিলেন, তাঁরা আগে থেকেই তাহসিফ ও দীপকে চিনতেন কি না এবং মাঠে তাঁদের উপস্থিতির বিষয়ে কিছু জানতেন কি না, তা তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
২৮ অক্টোবর: তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার
২৭ অক্টোবর রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর ২৮ অক্টোবর বুধবার বিকেলে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর আসে, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে।
খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
প্রাথমিকভাবে মরদেহটির পরিচয় জানা যায়নি। পরে তাঁর ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি।
মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে আসে। মরদেহের পেট ফোলা ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল কালো রঙের পোশাক ও সাদা ট্রাউজার। হাতে ঘড়ি এবং পকেটে আইফোন পাওয়া যায়।
পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
২৯ অক্টোবর: ময়নাতদন্ত, দাফন ও বাবার বক্তব্য
২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংরক্ষণ করা হয়।
ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। সেদিন আসরের নামাজের পর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
এদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, তাঁর ছেলে আত্মহত্যা করেনি। সরকারের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত অপরাধীদের পরিচয় বেরিয়ে আসবে।
বাবার বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ সাঁতারে প্রশিক্ষিত ছিলেন। এ কারণে নদীতে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, এমন ধারণা তিনি সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, তাহসিফের মোটরসাইকেলটি নিখোঁজ ছিল। এক মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তাঁকে বাইক চালাতে নিষেধ করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
প্রথম দিকে পরিবার এ ঘটনায় মামলা করতে আগ্রহী ছিল না। তবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ এবং বিভিন্ন তথ্য সামনে আসার পর আইনি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
৩০ অক্টোবর: তদন্তে পিবিআই, উদ্ধার হয় মোটরসাইকেল
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে নৌ পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছায়া তদন্ত শুরু করে।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায় তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। নদীর কাছাকাছি বস্তি এলাকায় এটি রাখা ছিল।
প্রথমে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছিল। পরে ১ নভেম্বর পিবিআই নিশ্চিত করে, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি তাহসিফেরই।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মিরপুর-২ এলাকার একটি শোরুম থেকে মোটরসাইকেলটি কিনেছিলেন তাহসিফ। এটি সুজুকি জিক্সার এসএফ মডেলের। মোটরসাইকেলটির নিবন্ধনও করা হয়নি।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহসিফ যদি মোটরসাইকেলে করে সেখানে গিয়ে থাকেন, তাহলে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সেটি কীভাবে পাওয়া গেল? কে বা কারা সেটি সেখানে রেখে গিয়েছিল?
মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের মাধ্যমে তদন্তকারীরা ঘটনার গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র পান।
৩০-৩১ অক্টোবর: দীপকে আটক ও হত্যা মামলা
তদন্তের অগ্রগতিতে দীপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে ৩০ অক্টোবরের আগের রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে তাঁকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পরে তাঁকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে ৩১ অক্টোবর শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এজাহারে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। রাতে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাসায় ফেরার কথা জানালেও আর ফিরে আসেননি। পরদিন তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মামলায় শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আসামি করা হয়নি। তবে তদন্তে তাহসিফের সঙ্গে সর্বশেষ থাকা দীপকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
৩১ অক্টোবর তাঁকে ঢাকার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এতে মামলার তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
১ নভেম্বর: দীপের তথ্যের ভিত্তিতে বান্ধবীকে গ্রেপ্তার
দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা তাঁর সঙ্গে থাকা তরুণীর সন্ধান করেন।
১ নভেম্বরের আগের রাতে রাজধানীর মিরপুর-১৪ এলাকা থেকে নিশাত তাসনিম দিশা নামের ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ।
তাঁকেও চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
তদন্তকারীরা জানতে চান, তাহসিফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় কীভাবে হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, ঘটনার দিন বারে কী ঘটেছিল এবং পরবর্তী সময়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার আগে ও পরে কী হয়েছিল।
বিশেষ করে দীপের বক্তব্যের সঙ্গে তরুণীর বক্তব্যের মিল-অমিল খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
২ নভেম্বর: মাদক সেবন ও নদীতে পড়ে যাওয়ার নতুন দাবি
দীপের রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তে নতুন একটি সম্ভাবনার কথা সামনে আসে।
দীপের দাবি, বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধের পর তাহসিফ হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান। সেখানে মাদক সেবনের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
একপর্যায়ে নদীতে পড়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীপ নিজেও তাহসিফকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেননি বলে জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দাবি করেন, তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকায় প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের চেয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না পুলিশ।
৩ নভেম্বর: দীপ ও দিশাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ
সর্বশেষ তথ্য: ৩ নভেম্বর ২০২৬
আজ মঙ্গলবার পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ হত্যা মামলায় চার দিনের রিমান্ডে থাকা দীপ ও নিশাত তাসনিম দিশাকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌ পুলিশ।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার জানিয়েছেন, দুজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে:
১. বারে তাহসিফ ও দিশার মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল?
২. তাঁদের বিরোধের প্রকৃত কারণ কী?
৩. টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার পর সেখানে কী ঘটেছিল?
৪. পুলিশের পোশাক পরা দুই সদস্যকে দেখে তাঁরা কেন পালিয়েছিলেন?
৫. তাহসিফের মোটরসাইকেল মাজার বস্তিতে রেখে আসার কারণ কী?
৬. রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠানোর সময় তাহসিফ কোথায় ছিলেন?
৭. দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল?
৮. ওই রাতে দায়িত্ব পালন করা আট সদস্যের পুলিশ টহল দলের সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না?
এ ছাড়া স্থানীয়দের দেওয়া ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন সিসিটিভি রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, দীপ ও দিশার বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
১৫. এখন পর্যন্ত তদন্তে যেসব বিষয় অমীমাংসিত
পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বর্তমান অবস্থা
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা
তিনি হেরোইন সেবন করেছিলেন কি না? দীপের দাবি; পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন
নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা কেউ দেখেছেন কি? দীপও দেখেননি বলে দাবি করেছেন
পুলিশের উপস্থিতিতে কী ঘটেছিল? টহল দলের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে
মোটরসাইকেল বস্তিতে পড়ে ছিল কেন? মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে নিশ্চিত, তবে সেখানে রেখে যাওয়ার পুরো ঘটনা যাচাইাধীন
দিশার সঙ্গে বিরোধের প্রকৃত কারণ কী? দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ চলছে
এটি হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু? চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় কী জানা যেতে পারে?
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তা ফিরোজ উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভিসেরা পরীক্ষার পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে মাদক বা বিষজাতীয় কোনো পদার্থের উপস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে শুধু মাদক পাওয়াই মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে না। মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষাগারের ফলাফলের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত এবং সাক্ষীদের বক্তব্য মিলিয়েই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় পাঁচটি রহস্য
প্রথম রহস্য: রাত ১টা ২০ মিনিটের পর কী ঘটেছিল?
দীপকে একা বের হতে দেখা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অথচ ১৫ মিনিট পর তাহসিফ মাকে বার্তা পাঠিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁর অবস্থান ও চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয় রহস্য: নদীতে পড়েছিলেন, নাকি অন্য কিছু ঘটেছিল?
দীপের বক্তব্যে নদীতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা রয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেও ঘটনাটি দেখেননি। ফলে এটি এখনো একটি অনুমান।
তৃতীয় রহস্য: মোটরসাইকেলটি সেখানে কেন পাওয়া গেল?
তাহসিফের মোটরসাইকেল মাজার বস্তি এলাকায় উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু মরদেহ পাওয়া গেছে কয়েক কিলোমিটার দূরে। মোটরসাইকেল সেখানে কে রেখেছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থ রহস্য: পুলিশের টহল দলের ভূমিকা কী?
ওই এলাকায় আট সদস্যের একটি টহল দল ছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তাঁদের কারও বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পঞ্চম রহস্য: বারের বিরোধের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি?
তাহসিফ ও দিশার মধ্যে বিরোধের কথা উঠে এসেছে। তবে সেই বিরোধের সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু দীপের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর উত্তরার একটি বারে বান্ধবীকে নিয়ে সময় কাটানো, বিরোধ, টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যাওয়া, পুলিশের উপস্থিতি, দুই বন্ধুর আলাদা হয়ে যাওয়া এবং পরদিন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
প্রথমে নিখোঁজ, এরপর মরদেহ উদ্ধার, মোটরসাইকেল খুঁজে পাওয়া, বন্ধুকে গ্রেপ্তার, হত্যা মামলা, বান্ধবীকে গ্রেপ্তার এবং সর্বশেষ দুজনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ, সব মিলিয়ে তদন্তের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাহসিফের মৃত্যু হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলার মতো চূড়ান্ত ফরেনসিক প্রতিবেদন বা তদন্তের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। দীপের বক্তব্য তদন্তের একটি সূত্র মাত্র, প্রমাণিত ঘটনা নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশের টহল দলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রধান তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাসস, ইত্তেফাক