ঢাকা, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

১৯ কার্তিক ১৪৩৩, ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

এআই প্রযুক্তির বিকাশে বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন বিনিয়োগ শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯:৩৯, ৩ নভেম্বর ২০২৬

এআই প্রযুক্তির বিকাশে বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন বিনিয়োগ শুরু

সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিকাশে বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। এ প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার, সার্ভার, উন্নত চিপ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণে আগামী কয়েক দশকে ব্যয় হতে পারে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা ও উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়বে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।

৩ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে শুধু ডেটা সেন্টার খাতেই মোট বিনিয়োগ ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। রেলপথ নির্মাণ কিংবা ইন্টারনেট অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো অতীতের বড় প্রযুক্তিগত বিনিয়োগকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এ ব্যয়ের পরিমাণ। 

কিন্তু বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে এআই থেকে পর্যাপ্ত আয় আসবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই অবকাঠামো নির্মাণে যুক্ত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী পাঁচ বছরে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন আয় তৈরি করতে হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির বিশ্লেষণে এ প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। 

২০৩১ সালের মধ্যে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের আয় প্রয়োজন

বেইন অ্যান্ড কোম্পানির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এআই খাতকে বছরে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার আয় করতে হবে, যাতে ডেটা সেন্টারসহ এ খাতে করা বিপুল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, ভোক্তা পর্যায়ের এআই সেবা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি থেকে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার আয় আসতে পারে। ফলে বাকি ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় নতুন বাজার ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা থেকে তৈরি করতে হবে।

বেইনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এ বিপুল অর্থের সংস্থান করা সম্ভব হবে না। এআইনির্ভর রোবট, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, শিল্পকারখানার অটোমেশন, ওষুধ আবিষ্কার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জ্বালানি উৎপাদনের মতো নতুন ক্ষেত্র থেকে বড় ধরনের আয় আসতে হবে। 

বেইনের গ্লোবাল টেকনোলজি, মিডিয়া অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডেভিড ক্রফোর্ডের মতে, এআই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে অনেক দ্রুত। এ বিনিয়োগ টেকসই করতে বৈশ্বিক অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর মতে, মোবাইল ও ক্লাউড প্রযুক্তির বিকাশের সময় যে ধরনের উদ্ভাবন দেখা গিয়েছিল, এআই খাতের আয় বাড়াতে তার চেয়েও বড় উদ্ভাবনের ঢেউ প্রয়োজন। 

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল ব্যয়

এআইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে মাইক্রোসফট, গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা ও ওরাকলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। উন্নত চিপ, সার্ভার, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতেও চলছে বড় বিনিয়োগ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের আগামী বছরগুলোতে ৫১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের আয়ের তুলনায় এ ব্যয় শতগুণেরও বেশি। ফলে এআই খাতে বিনিয়োগের গতি ও সম্ভাব্য আয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

পিডব্লিউসির ২০২৬ সালের গ্লোবাল ডেটা সেন্টার আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল পর্যন্ত ডেটা সেন্টার অবকাঠামোয় মোট বিনিয়োগ ৩১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৬ সালে এ খাতে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। তবে এ পূর্বাভাস নির্ভর করছে এআইয়ের ব্যবহার ও চাহিদা কত দ্রুত বাড়ে তার ওপর। 

বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংকট

ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এআইয়ের উন্নত মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত জিপিইউ এবং অন্যান্য প্রসেসিং যন্ত্রপাতি প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে। ফলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

বেইনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টার খাতে মোট ব্যয় ৫ থেকে সাড়ে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এ সময় অন্তত ১৫০ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ, পানি, ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য অবকাঠামোর সংকট প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় বিরোধিতার কারণে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৬৮ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রকল্প আটকে যাওয়া বা বিলম্বিত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

উৎপাদনশীলতা বাড়বে, নাকি বিনিয়োগে বুদ্‌বুদ তৈরি হবে?

এআই প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্র, গবেষণা, চিকিৎসা, শিল্প উৎপাদন ও সেবাখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে তার সুফল কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জেপি মরগানের বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বাজারমূল্যকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে আগামী এক দশক ধরে দেশটির উৎপাদনশীলতা বছরে ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারে বাড়তে হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাসে এ সময়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে বছরে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও অর্থনীতির প্রচলিত পূর্বাভাসের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডায়ান কোয়েলের মতে, অতীতের বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর সুফল অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে ১০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে এআইয়ের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা অর্জনে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এআই খাতে বিনিয়োগের গতি যদি ভবিষ্যৎ আয় ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চাহিদা কমে যাওয়া কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তবে বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণ না হলেও নির্মিত ডেটা সেন্টার ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ভবিষ্যতে অর্থনীতির কাজে লাগতে পারে। রেলপথ কিংবা ইন্টারনেটের মতো অতীতের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের উদাহরণ দিয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রাথমিক বিনিয়োগে আর্থিক সংকট তৈরি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এসব অবকাঠামো অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

সূত্র: রয়টার্স, পিডব্লিউসি, বেইন অ্যান্ড কোম্পানি ও ব্লুমবার্গ।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন