আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:১৬, ৩ নভেম্বর ২০২৬
সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক বিভাগ (ডেফরা) এবং প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সংস্থার (এপিএইচএ) সর্বশেষ ৩০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া এই মৌসুমে সংক্রমণ দ্রুত বেড়েছে। মৌসুমের প্রথম তিন মাসেই আক্রান্ত খামারের সংখ্যা আগের তিন মৌসুমের মোট সংক্রমণকে ছাড়িয়ে যায়। ৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আক্রান্ত খামারের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২০১। পরবর্তী সময়ে তা আরও বেড়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ১ হাজার ১০৩টি খামারে রোগটি শনাক্ত হয়েছিল। ওই সময় পর্যন্ত সংক্রমণের সংখ্যা আগের তিন মৌসুমের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি ছিল।
ইংল্যান্ড ছাড়িয়ে স্কটল্যান্ডেও বিস্তার
প্রথমদিকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি সংক্রমণ দেখা গেলেও ধীরে ধীরে রোগটি উত্তরের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মে প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ডে ব্লুটাং শনাক্ত হয়। দেশটির অ্যাবারডিনশায়ার পর্যন্ত পৌঁছেছে রোগটি।
ডেফরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে গ্রেট ব্রিটেনে মোট ৩৪৮টি খামারে ব্লুটাং শনাক্ত হয়েছিল। এর আগের ২০২৪-২৫ মৌসুমে সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ১৬৩। আর ২০২৩-২৪ মৌসুমে ইংল্যান্ডের ৭৩টি খামারে ১২৬টি সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। সে হিসাবে এবারের সংক্রমণ আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
চলতি মৌসুমে যুক্তরাজ্যে প্রধানত ব্লুটাং ভাইরাসের সেরোটাইপ-৩ বা বিটিভি-৩ শনাক্ত হচ্ছে। ২০২৩ সালে ১৫ বছরের বেশি সময় পর ইংল্যান্ডে এই ধরনটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। এর আগে ২০০৭-০৮ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিটিভি-৮ ধরনের সংক্রমণ যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বাড়ছে রোগবাহী কীট
ব্লুটাং একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সংক্রমিত ক্ষুদ্র দংশনকারী কীট, বিশেষ করে কুলিকয়ডিস প্রজাতির মিজ বা ক্ষুদ্র উড়ন্ত কীটের মাধ্যমে এটি এক পশু থেকে অন্য পশুতে ছড়ায়। রোগটি সরাসরি পশু থেকে পশুতে ছড়ায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ ও উষ্ণ হওয়া এবং শীতের তীব্রতা কমে যাওয়ায় রোগবাহী কীটের বংশবিস্তার ও সক্রিয় থাকার সময় বাড়ছে। আগে যেসব এলাকায় তাপমাত্রা কম থাকায় এসব কীটের টিকে থাকা কঠিন ছিল, সেখানেও এখন তাদের বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ ও জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক টম ক্যান্টিলন দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, এবারের রেকর্ড সংক্রমণ ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের রোগের বিস্তারের পূর্বাভাস দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীত অপেক্ষাকৃত উষ্ণ এবং গ্রীষ্ম আরও গরম হলে আগে যেসব কীটপতঙ্গ ও রোগজীবাণু যুক্তরাজ্যে টিকে থাকতে পারত না, সেগুলোও সেখানে স্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউওএএইচ) জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইউরোপে ব্লুটাংয়ের বিস্তারের সম্পর্কের কথা জানিয়েছে। আফ্রিকায় উৎপত্তি হওয়া ভাইরাসটি গত দুই দশকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
পশুর শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা যায়
ব্লুটাংয়ে আক্রান্ত ভেড়া ও গবাদিপশুর শরীরে জ্বর, মুখে ঘা, ঠোঁট ও জিহ্বা ফুলে যাওয়া, মাথা-ঘাড়ে ফোলা, চোখ ও নাক দিয়ে তরল নিঃসরণ এবং খুঁড়িয়ে হাঁটার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগের নাম ব্লুটাং হওয়ার কারণ, কিছু আক্রান্ত পশুর জিহ্বা নীলচে হয়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় জিহ্বা মুখের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে এবং প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে।
ভেড়ার ক্ষেত্রে রোগটির লক্ষণ তুলনামূলক বেশি গুরুতর হতে পারে। গবাদিপশুর দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া, গর্ভপাত, মৃত বাচ্চা প্রসব এবং প্রজননজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে আক্রান্ত সব পশুর শরীরে দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না।
টিকা দিতে বলছে কর্তৃপক্ষ, সংকটে খামারিরা
রোগের বিস্তার ঠেকাতে খামারিদের পশুদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ। দেশটির জাতীয় কৃষক ইউনিয়নের সহসভাপতি রবিন মুন্ট বলেছেন, খামারিদের নিয়মিত পশু পরীক্ষা করতে হচ্ছে এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
তবে চাহিদার তুলনায় টিকার সরবরাহ পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেক খামারি সমস্যায় পড়েছেন। খরার কারণে পশুখাদ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি টিকা দেওয়া, আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা এবং অতিরিক্ত পরিচর্যার খরচ খামারিদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
যুক্তরাজ্যের উপপ্রধান পশুচিকিৎসা কর্মকর্তা এলে ব্রাউনও খামারিদের পশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে পশুচিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। টিকা নেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে বলে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
মানুষের জন্য ঝুঁকি নেই
ব্লুটাং পশুদের জন্য গুরুতর রোগ হলেও এটি মানুষের মধ্যে ছড়ায় না। আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শ, পশম কিংবা দুধ পান করার মাধ্যমে মানুষের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি নেই। ফলে রোগটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়। তবে পশু মারা যাওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং প্রাণী পরিবহনে বিধিনিষেধের কারণে কৃষি ও পশুপালন খাতে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান, নিয়মিত নজরদারি এবং রোগবাহী কীট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় প্রাণীর রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, যুক্তরাজ্যের ডেফরা ও প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সংস্থা।