ঢাকা, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

১৯ কার্তিক ১৪৩৩, ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮

২৮ বছরের বিশ্বভ্রমণ শেষে মায়ের কোলে ফিরলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮:৫৫, ৩ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৫৬, ৩ নভেম্বর ২০২৬

২৮ বছরের বিশ্বভ্রমণ শেষে মায়ের কোলে ফিরলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী

সংগৃহীত

  • ২৮ বছরের দুঃসাহসিক পদযাত্রার অবসান, ৫০ হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে মায়ের কাছে ফিরলেন কার্ল বুশবি
  • চার মহাদেশ ও ৩০টি দেশ পাড়ি, বেরিং প্রণালির বরফ, বিপজ্জনক জঙ্গল, মরুভূমি ও সাগর পেরিয়ে অবশেষে ঘরে ফিরলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী

দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটে বিশ্বভ্রমণ শেষে মায়ের কাছে ফিরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই ব্যতিক্রমী অভিযান শেষ হয়েছে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হালে মায়ের বাড়ির সামনে। সোমবার (২ নভেম্বর) ৫৭ বছর বয়সী বুশবি যখন বাড়ির সামনে পৌঁছান, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় ছিলেন মা অ্যাঞ্জেলা বুশবি, পরিবারের সদস্য ও শত শত মানুষ।

বাড়ির সামনে ছেলেকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা। ২৮ বছর আগে যে ছেলে বাড়ি ছেড়েছিলেন, তাঁকে আবার সামনে পেয়ে জড়িয়ে ধরেন তিনি। বাড়ির বাইরে টানানো ছিল ‘ওয়েলকাম হোম সন’ লেখা ব্যানার। দীর্ঘ এই অভিযানের সমাপ্তি দেখতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, ১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর চিলির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর পুন্তা আরেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন বুশবি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর। সাবেক এই ব্রিটিশ প্যারাট্রুপার ৫৭ বছর বয়সে নিজ দেশে ফিরলেন। তাঁর অভিযানের নাম ছিল ‘গোলিয়াথ এক্সপেডিশন’।

বাবার জন্মদিনের কার্ড থেকে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা

বুশবির বিশ্বভ্রমণের ধারণাটি তৈরি হয়েছিল বাবার পাঠানো একটি জন্মদিনের কার্ড থেকে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি তাঁর বাবা কিথ বুশবি একটি কার্ডে বিশেষ বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের মধ্যে হওয়া একটি আলোচনা তুলে ধরেন। আলোচনার বিষয় ছিল, একসময় বরফে ঢাকা বেরিং প্রণালি পেরিয়ে পায়ে হেঁটে লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক যাওয়া সম্ভব কি না।

বেরিং প্রণালি এশিয়া ও উত্তর আমেরিকাকে পৃথক করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে গেলে প্রাচীনকালে এই অঞ্চল দিয়ে মানুষ এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে গিয়েছিল বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা রয়েছে। বাবার পাঠানো সেই ধারণাই বুশবির মনে দুঃসাহসিক অভিযানের স্বপ্ন তৈরি করে।

প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যেই যাত্রা শেষ করতে পারবেন। পরে বুঝতে পারেন, পথটি তাঁর ধারণার চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ ও কঠিন। শেষ পর্যন্ত সেই অভিযান গড়ায় প্রায় তিন দশকে।

চার মহাদেশ, ৩০ দেশ ও ৫০ হাজার কিলোমিটার

চিলি থেকে যাত্রা শুরু করে বুশবি দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন পথ অতিক্রম করেন। সব মিলিয়ে চারটি মহাদেশের ৩০টি দেশ পেরিয়ে তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছান। তাঁর অতিক্রান্ত দূরত্ব প্রায় ৩১ হাজার মাইল, অর্থাৎ ৫০ হাজার কিলোমিটার।

অভিযানের অন্যতম কঠিন অংশ ছিল আলাস্কা ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালি অতিক্রম। ২০০৬ সালে অভিযাত্রী দিমিত্রি কিফারের সঙ্গে বরফাচ্ছন্ন এই প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পথে বরফ ভেঙে হিমশীতল পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, মেরুভাল্লার মুখোমুখি হওয়া এবং সরঞ্জাম হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তাঁরা। একপর্যায়ে নিরাপত্তার কারণে তাঁদের আকাশপথে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আবার অভিযান শুরু করেন।

প্রণালিটি পেরিয়ে রাশিয়ায় প্রবেশের পর অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়। নির্বাসনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। এরপর রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড পেরোতে গিয়ে ভিসা জটিলতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় বারবার বাধার মুখে পড়েন তিনি।

রাশিয়ার ভিসার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৬০০ কিলোমিটার হাঁটা

বুশবির অভিযানে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় লেগেছে রাশিয়া পেরোতে। দেশটিতে প্রায় এক দশক ধরে থেমে থেমে তাঁকে পথ চলতে হয়েছে। প্রচণ্ড শীতের কারণে বছরের কয়েক মাসের বেশি হাঁটা সম্ভব হতো না। তার ওপর ভিসা ও প্রশাসনিক জটিলতা তাঁর যাত্রাকে বারবার আটকে দেয়।

২০১২ সালে রাশিয়া তাঁকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিবাদ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে রুশ দূতাবাস পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মাইল বা ৫ হাজার ৬০০ কিলোমিটার হাঁটেন বুশবি। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পথ তৈরি হয়।

মধ্য আমেরিকার বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপ অতিক্রমের সময়ও তাঁকে প্রাণঘাতী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কলম্বিয়া ও পানামার মধ্যবর্তী এই দুর্গম জঙ্গল, পাহাড় ও জলাভূমিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঝুঁকি ছিল। ২০০১ সালে ওই এলাকা পেরোনোর পর সীমান্তের সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশের অভিযোগে পানামায় ১৮ দিন কারাগারেও থাকতে হয় তাঁকে।

সাগর পেরিয়েছেন সাঁতরে, নেননি কোনো যানবাহনের সহায়তা

বুশবির অভিযানের অন্যতম ব্যতিক্রমী দিক ছিল যাত্রাপথে কোনো যানবাহনের সাহায্যে সামনে এগিয়ে না যাওয়ার অঙ্গীকার। স্থলপথে হেঁটেছেন, আবার জলপথের বাধা পেরিয়েছেন সাঁতরে। তাঁর এই শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অন্তর্দেশীয় জলাশয় কাস্পিয়ান সাগরও সাঁতরে পার হতে হয়েছে।

রাশিয়া ও ইরান হয়ে নির্ধারিত পথ ব্যবহার করা সম্ভব না হওয়ায় কাস্পিয়ান সাগর পেরোনোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ জন্য ৩১ দিন ধরে পানিতে ছিলেন বুশবি। ফ্লোটেশন ভেস্ট ও বিশেষ পোশাক পরে ভেসে থাকা এবং হাত নাড়ানোর মাধ্যমে সামনে এগোনোর একটি কৌশল ব্যবহার করেন। নিজের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিকে তিনি ‘ফ্লোটিমিং’ নামে উল্লেখ করেছেন।

এ ছাড়া গত মাসে ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান তিনি। এরপর শুরু হয় নিজ শহর হালের পথে শেষ পর্যায়ের পদযাত্রা।

অর্থসংকট, করোনা ও যুদ্ধেও থামেনি অভিযান

দীর্ঘ অভিযানে শুধু প্রাকৃতিক বাধাই নয়, আর্থিক ও বৈশ্বিক সংকটও মোকাবিলা করতে হয়েছে বুশবিকে। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় তাঁর পৃষ্ঠপোষকদের অর্থায়ন কমে যায়। এতে অভিযান দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়।

২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও সীমান্ত চলাচলে বিধিনিষেধ তৈরি হলে আবারও থেমে যায় তাঁর যাত্রা। বিভিন্ন দেশের ভিসা, সীমান্ত পারাপারের অনুমতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে।

এত বাধার পরও অভিযান শেষ করার সংকল্প থেকে সরে আসেননি বুশবি। তাঁর লক্ষ্য ছিল, যাত্রা শেষ না করে বাড়ি ফিরবেন না।
এক দশক পর মায়ের সঙ্গে দেখা

সোমবার হালের সিটি হলে পৌঁছালে শত শত মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান। সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে রসিকতা করে বুশবি বলেন, ‘অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত। তাহলে কি শেষ হলো?’

পরে মায়ের বাড়ির দিকে শেষ কয়েক মাইলের পথ পাড়ি দেন তিনি। দীর্ঘদিনের সঙ্গী দুই চাকার একটি ছোট ট্রলি ঠেলে বাড়ির সামনে পৌঁছান। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন মা অ্যাঞ্জেলা। প্রায় এক দশক পর মায়ের সঙ্গে দেখা হলো তাঁর।

বুশবি বলেন, ‘মানুষ বলে, একটি কাজ সম্পন্ন করতে পুরো গ্রামের সহযোগিতা লাগে। কিন্তু আমাকে এখানে ফিরিয়ে আনতে আক্ষরিক অর্থেই পুরো পৃথিবীর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছে। অসংখ্য মানুষের সহায়তা পেয়েছি। আমি একা এই যাত্রা শেষ করতে পারতাম না।’

অভিযান শেষে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন দূরে থাকার কারণে ছেলে অ্যাডামের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে মাত্র কয়েকবার। এবার ১২ বছর বয়সী নাতনির সঙ্গেও প্রথমবার দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন।

এবার কী করবেন বুশবি?

২৮ বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে জীবন কাটানোর পর এবার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন বুশবি। দীর্ঘদিনের পরিচিত পথ, বিভিন্ন দেশের মানুষ ও অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। নিজ দেশে ফিরলেও এত বছর পর ঘরকে নতুন করে চিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এপি ও সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বুশবি বলেন, দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরলেও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার কিছু অংশ এখন তাঁর কাছে ঘরের মতো মনে হয়। এত বছর ধরে পরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছানোর চিন্তায় ছিলেন। এখন সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় সামনে কী করবেন, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

তাঁর অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি নিজের স্মৃতিকথার পরবর্তী পর্ব প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।

বুশবির এই ২৮ বছরের অভিযান শুধু দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প নয়; এটি ধৈর্য, সংকল্প, মানুষের সহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্য ধরে রাখার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ১৯৯৮ সালে যে তরুণ বাড়ি ছেড়েছিলেন, ২০২৬ সালে সেই মানুষই ফিরেছেন জীবনের প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, সিবিএস নিউজ ও স্কাই নিউজ।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন