বাসস
প্রকাশ: ০৭:২৭, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
বর্তমানে দেশে তুলার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে বস্ত্রশিল্পের কাঁচামালের বড় অংশই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা ও ১৩২টি উপজেলায় প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়। এতে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার বেল আঁশতুলা উৎপাদিত হচ্ছে।
সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, দেশের ৫০টির বেশি জেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ বেল, ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
তুলা চাষের আওতা বাড়ানোর জন্য মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে চাষ হওয়া তুলার মধ্যে ৬৯ শতাংশ জমিতে উফশী এবং ৩১ শতাংশ জমিতে পাহাড়ি জাতের তুলা উৎপাদিত হয়। নতুন পরিকল্পনায় উঁচু চরাঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল, উপযোগী পাহাড়ি জমি, কম উর্বর ও কম উৎপাদনশীল জমি, লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকা তুলা চাষের আওতায় আনার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ফলের বাগান, সবজি, ডাল ও মসলার সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবেও তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারি খাসজমি ব্যবহারের বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় দেশের তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে সিডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভায়ও তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয় কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
স্বাধীনতার পর শুরু তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ
দেশের বস্ত্রশিল্পে কাঁচা তুলার সংকট মোকাবিলায় স্বাধীনতার পরপরই তুলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে তুলা চাষ শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে রংপুর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উফশী জাতের ‘ডেল্টাপাইন-১৬’ তুলার চাষ সম্প্রসারণ করা হয়।
১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলাবীজ আমদানির পর গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে তুলা গবেষণা ও বীজ উৎপাদনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সিডিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খামারের নাম পরিবর্তন করে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’ রাখেন। ১৯৯৪ সালে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি তুলা খামার উদ্বোধন করেন।
বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি সংযোজন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তুলা গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বীজ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষ জনবল তৈরি, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জনবল সংকটে উৎপাদন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ
তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সিডিবির জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বোর্ডের অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৪৮৩ জন। ফলে ৩৮১টি পদ শূন্য রয়েছে। মাঠপর্যায়ে চাষ সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদন কার্যক্রম তদারকিতে এই ঘাটতি প্রভাব ফেলতে পারে।
সিডিবির মৃত্তিকা পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজার মতে, তুলা একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল। কৃষকদের এ চাষে উৎসাহিত করা গেলে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের কাঁচা তুলা আমদানির চাপও কমাতে পারবেন।
সিডিবির বিশেষজ্ঞদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ওই জমিতে প্রায় ১৫ মণ তুলা উৎপাদিত হলে কৃষকের আয় হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। তবে এই আয় উৎপাদন, বাজারদর ও অন্যান্য ব্যয়ের ওপর নির্ভর করবে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দাবি, দেশে প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি ব্যয়ের চার মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সাধারণত জুনের মাঝামাঝি তুলার বীজ বপন শুরু হয় এবং ডিসেম্বর মাসে ফসল সংগ্রহ করা হয়।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে তুলা
তুলা চাষের আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত উপকারিতার কথাও তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। সিডিবির জ্যেষ্ঠ জিনিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেনের মতে, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। একই জমিতে বারবার ভুট্টা চাষের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার ঝুঁকির বিপরীতে ফসলের বৈচিত্র্য বজায় রাখতে তুলা চাষ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে দেশের মোট তুলার চাহিদা ও স্থানীয় উৎপাদনের হিসাব নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্যও রয়েছে। এক হিসাবে স্থানীয় উৎপাদনে চাহিদার ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পূরণ হওয়ার কথা বলা হলেও অন্য হিসাবে বস্ত্রশিল্পের ব্যবসায়িক চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ মেটানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্প খাতে বছরে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানিতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশাল আমদানি ব্যয় কমাতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাষযোগ্য জমি সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, গবেষণা জোরদার এবং মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট কাটানো জরুরি হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের বস্ত্রশিল্পে স্থানীয় তুলার অবদান বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।