এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭:৪২, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
সংগৃহীত
সোমবার (১২ অক্টোবর) স্টকহোমে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অর্থনীতিতে এ পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরস্কার’।
নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়, হল ও উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তাদের কাজের মাধ্যমে বিকশিত নিউ কেইনসীয় মডেল ব্যবসায়িক চক্র, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনের ওপর অর্থনৈতিক নীতির প্রভাব বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় এসব মডেল ব্যবহার করে।
কেইনসীয় তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা থেকে নতুন অর্থনৈতিক মডেল
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে কেইনসীয় অর্থনীতির ব্যাপক প্রভাব ছিল। এ তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী উপকরণগুলোর একটি ছিল ‘ফিলিপস কার্ভ’, যা বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে সম্ভাব্য বিপরীতমুখী সম্পর্ক তুলে ধরে। সে সময় অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করা হতো।
তবে ১৯৭০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংকট প্রচলিত ধারণাগুলোর সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে আসে। ওই সময়ে বিভিন্ন দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ বেকারত্ব একসঙ্গে দেখা দেয়, যা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ নামে পরিচিত। এ পরিস্থিতি অর্থনীতি বিশ্লেষণে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা, সিদ্ধান্ত এবং আচরণকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়।
অর্থনীতিবিদ রবার্ট লুকাসসহ গবেষকেরা দেখান, শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক দিয়ে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন। বরং পরিবার, ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পৃথক সিদ্ধান্ত কীভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই নিউ কেইনসীয় অর্থনৈতিক মডেলের বিকাশ ঘটে। রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা এ মডেলকে তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ করে এবং অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষণের নতুন ভিত্তি গড়ে তোলে।
রবার্ট ই. হলের গবেষণায় ভোগব্যয় ও ভবিষ্যৎ আয়ের প্রত্যাশা
রবার্ট ই. হলের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল পারিবারিক ভোগব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশার সম্পর্ক। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখানো হয়, ভবিষ্যৎ আয় ও সম্পদ সম্পর্কে নতুন তথ্য ভোক্তাদের ব্যয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ধারণা অনুযায়ী, মানুষ শুধু বর্তমান আয়ের ভিত্তিতে ভোগব্যয় নির্ধারণ করে না। ভবিষ্যতে আয় বাড়বে বা কমবে, সে সম্পর্কে প্রত্যাশাও তাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বর্তমান আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হলে কেউ ভোগব্যয় বাড়াতে পারেন।
অন্যদিকে, যেসব পরিবার মূলত বর্তমান আয়ের ওপর নির্ভর করে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করে, তাদের ক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়া বা সাময়িক আর্থিক সংকটের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। অর্থনীতিতে এ ধরনের ভোক্তাকে ‘হ্যান্ড-টু-মাউথ’ ভোক্তা বলা হয়।
পরিবারগুলোর মধ্যে এই পার্থক্য বোঝা মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির প্রভাব বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার পরিবর্তন, করনীতি কিংবা সরকারি ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কীভাবে ভোগব্যয় ও সামগ্রিক চাহিদাকে প্রভাবিত করে, তা নির্ধারণে এ গবেষণা অর্থনীতিবিদদের সহায়তা করে।
মুদ্রানীতির বিশ্লেষণে মাইকেল উডফোর্ডের অবদান
মাইকেল উডফোর্ড আধুনিক মুদ্রানীতি বিশ্লেষণে একটি সমন্বিত তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার বই Interest and Prices: Foundations of a Theory of Monetary Policy এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ গ্রন্থে অর্থনৈতিক তত্ত্ব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশাকে একত্র করে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি সুসংহত বিশ্লেষণ এতে তুলে ধরা হয়।
উডফোর্ডের গবেষণায় ‘সুদের স্বাভাবিক হার’ ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার পরিবর্তনের প্রভাব নির্ভর করে অর্থনীতির পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে ধারণার ওপর। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি শুধু বর্তমান সুদের হার নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ হিসেবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য সংকেত দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা তাদের বিনিয়োগ, ব্যয় এবং মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সে অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারে।
পণ্য ও সেবার দাম সব সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় না। দাম পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদন, বিপণন ও প্রশাসনিক ব্যয় যুক্ত থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য সমন্বয় করতে পারে না। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতিকে ‘মূল্যের অনমনীয়তা’ বলা হয়। মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদনের ওপর মুদ্রানীতির প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে এ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন ব্যবধান ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্লেষণ
আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘উৎপাদন ব্যবধান’ বা ‘আউটপুট গ্যাপ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর মাধ্যমে কোনো অর্থনীতির প্রকৃত উৎপাদন এবং টেকসইভাবে উৎপাদন করার সম্ভাব্য সক্ষমতার মধ্যকার পার্থক্য বোঝানো হয়। উৎপাদন ব্যবধান ও মূল্যস্ফীতির প্রবণতা বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হারসহ বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পারে।
অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের অভিঘাত বা আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দেয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিপরীতে, জ্বালানি বা কাঁচামালের ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি পেলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। ভবিষ্যৎ আয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে চাহিদা কমেও যেতে পারে।
নিউ কেইনসীয় মডেল এসব পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সম্ভাব্য করণীয় বিশ্লেষণে সহায়তা করে। যেমন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত রাখার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হয়।
সুদের হার বাড়ালে চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় কমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই কোন ধরনের অভিঘাত তৈরি হয়েছে এবং তা কত দিন স্থায়ী হতে পারে, তার ওপর নীতিগত সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নির্ভর করে।
কোভিড-১৯ মহামারি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনৈতিক নীতির সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নে বিভিন্ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করেছে। এসব মডেল নীতিনির্ধারণে সহায়ক হলেও সব ধরনের সংকট প্রতিরোধ বা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করার নিশ্চয়তা দেয় না।
দুই অর্থনীতিবিদের পরিচিতি
রবার্ট ই. হল ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং হুভার ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যদিকে, মাইকেল উডফোর্ড ১৯৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে এমআইটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। দুই বিজয়ীর মধ্যে এ অর্থ সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে।