ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

মেসির বিদায়ের পর কে হলেন আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক

এইচভি নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮:৩৩, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেসির বিদায়ের পর কে হলেন আর্জেন্টিনার নতুন অধিনায়ক

লিওনেল মেসির যুগ শেষ। ২১ বছর আর্জেন্টিনার জার্সিতে আলো ছড়ানোর পর ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন দেশটির সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। মেসির বিদায়ের সঙ্গে শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়। এবার সেই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব মাঠের নেতা হিসেবে পেলেন ক্রিশ্চিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের নতুন অধিনায়ক হিসেবে এই ডিফেন্ডারকে বেছে নিয়েছেন প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি।

মেসির পর আর্জেন্টিনার অধিনায়ক কে হবেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর থেকেই তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। সম্ভাব্য অধিনায়ক হিসেবে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, লাওতারো মার্তিনেজ, রদ্রিগো দে পলসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত স্কালোনির পছন্দ রোমেরো। টিওয়াইসি স্পোর্টসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসি ও নিকোলাস ওতামেন্দির বিদায়ের পর রোমেরোকেই দলের নেতৃত্বের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিল আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফ।

মেসির পর নতুন অধ্যায়

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির অভিষেক হয়েছিল ২০০৫ সালে। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের প্রতীক হয়ে ছিলেন তিনি। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটায়। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে আলবিসেলেস্তেরা।

২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি ছিলেন দলের অধিনায়ক। টুর্নামেন্টে তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যান। তবে ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।

মেসির বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়, আর্জেন্টিনা দলের নেতৃত্ব কাঠামোয়ও বড় পরিবর্তন। তাঁর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিও জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে।

কেন রোমেরো?

রোমেরোকে অধিনায়ক করার সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর নেতৃত্বের গুণ। ২৮ বছর বয়সী এই সেন্টারব্যাক শুধু রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় নন, মাঠে তাঁর আগ্রাসী মানসিকতা, দৃঢ়তা ও সতীর্থদের সংগঠিত করার ক্ষমতাও কোচিং স্টাফের নজরে এসেছে।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সময়ও রোমেরো ছিলেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালসহ প্রায় পুরো টুর্নামেন্টেই রক্ষণভাগে তাঁর উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের ফিনালিসিমা জয়ের দলেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর অর্জনের তালিকায় ২০২২ বিশ্বকাপের পাশাপাশি দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমার শিরোপা রয়েছে।

মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রোমেরোর আছে। টটেনহাম হটস্পারে খেলার সময় তিনি ক্লাবটির অধিনায়কত্ব করেছেন। ২০২৫ সালে টটেনহামের অধিনায়ক হন এবং ইউরোপা লিগ জয়ে দলকে নেতৃত্ব দেন। ২০২৬ সালে টটেনহাম ছেড়ে আতলেতিকো মাদ্রিদে যোগ দেন তিনি। স্প্যানিশ ক্লাবটির বর্তমান খেলোয়াড় তালিকাতেও রোমেরোকে অভিজ্ঞ ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন সেন্টারব্যাক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

রক্ষণভাগ থেকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে

রোমেরোর নেতৃত্ব পাওয়ার আরেকটি তাৎপর্য হলো—মেসির মতো আক্রমণভাগের মহাতারকার পর এবার আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব যাচ্ছে একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের হাতে।

মেসির নেতৃত্ব ছিল মূলত সৃজনশীলতা, গোল, পাস ও মাঠে অসাধারণ ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। রোমেরোর নেতৃত্বের ধরন হবে ভিন্ন। তিনি রক্ষণভাগ থেকে সতীর্থদের নির্দেশনা দেবেন, দলকে সংগঠিত রাখবেন এবং প্রয়োজনে মাঠে আগ্রাসী মানসিকতার মাধ্যমে নেতৃত্ব দেবেন।

আতলেতিকো মাদ্রিদের ওয়েবসাইটে রোমেরোকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী, দ্রুত প্রতিপক্ষের আক্রমণ আঁচ করতে সক্ষম এবং ট্যাকেলে দৃঢ় একজন অভিজ্ঞ সেন্টারব্যাক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠে তাঁর নেতৃত্বের গুণও তুলে ধরা হয়েছে।

মেসির ছায়া পেরোনোর চ্যালেঞ্জ

রোমেরোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবশ্যই মেসির ছায়া পেরিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মেসি শুধু অধিনায়ক ছিলেন না; দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনা দলের খেলাধুলার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, প্রতিপক্ষের ওপর আলাদা চাপ তৈরি করেছে এবং সমর্থকদের মধ্যেও তৈরি করেছে বিশেষ প্রত্যাশা।

সেই জায়গায় রোমেরোর দায়িত্ব হবে ভিন্ন। তাঁকে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পুরোনো বিশ্বকাপজয়ী দলের অভিজ্ঞদের সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে মাঠে স্কালোনির কৌশল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক সদস্য এখনো আর্জেন্টিনার সঙ্গে আছেন। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, রদ্রিগো দে পল, লাওতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের মতো খেলোয়াড়েরা নতুন যুগের মূল ভিত্তি হতে পারেন। তবে মেসি ও ওতামেন্দির মতো অভিজ্ঞ নেতাদের বিদায়ের পর দলের ভেতরের নেতৃত্বের ভার আরও কয়েকজনের ওপর ভাগ করে নিতে হবে।

রোমেরোর পাশে অভিজ্ঞরা

নতুন অধিনায়ক হিসেবে রোমেরো একা নন। তাঁর পাশে থাকবেন দীর্ঘদিনের সতীর্থরা। বিশেষ করে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের মুখ হিসেবে থাকবেন।

মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। ২০২১ কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা—টানা বড় শিরোপা জয়ের পর দলটি এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

স্কালোনির জন্যও এটি বড় পরীক্ষা। তাঁর কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। মেসি-পরবর্তী যুগে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে নতুন নেতৃত্বকে কার্যকর করে তুলতে হবে।

শুরু হচ্ছে রোমেরোর যুগ

মেসির বিদায়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। এবার শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত রোমেরোর হাতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড।

মেসির মতো আরেকজন খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব নয় এ কথা আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফ ও সমর্থকেরাও জানেন। তাই মেসির শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা না করে নতুন কাঠামো গড়ে তোলাই হবে দলের লক্ষ্য।

রোমেরোর সামনে সেই নতুন কাঠামোর নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা জেতা দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি জানেন সাফল্যের স্বাদ। এবার তাঁকে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনাকে।

আর্জেন্টিনার আর্মব্যান্ড এখন তাঁর হাতে। মেসির অধ্যায়ের পর রোমেরোর নেতৃত্বে আলবিসেলেস্তেরা কতটা সফলভাবে নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন