আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯:৫৪, ২৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩১, ২৭ আগস্ট ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ি ঢল ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে আসায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। তীব্র স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মানুষ স্রোতের সঙ্গে ভেসে যান এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়েন।
দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নিখোঁজ মানুষের বড় একটি অংশ এখনো সন্ধানহীন। নেপালের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটন মৌসুমে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক চলাচল করায় নিখোঁজদের তালিকায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয়, ১২৭ জন নেপালি, ৬৫ জন আমেরিকান এবং ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজদের তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে।
নিখোঁজদের মধ্যে সেনা ও পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। দুর্যোগের পর স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা যৌথভাবে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় মোবাইল ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অচল থাকায় পরিবারগুলোর সঙ্গে অনেকের যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, হিমবাহ ধস ও তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের ওপর জমে থাকা বরফ, পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসায় নদীগুলোতে পানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দুর্যোগ অত্যন্ত দ্রুত ঘটে এবং মানুষের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় খুব কম থাকে। হিমবাহ বা পাহাড়ের কোনো অংশ ধসে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর নদীতে নেমে আসে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হঠাৎ করে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি হতে পারে।
ইউএসজিএস সতর্ক করেছে, নদীগুলোতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় পরবর্তী সময়ে আরও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের পর পরিস্থিতি দেখতে বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি নুয়াকোট জেলার বিদুর ও আশপাশের জনপদ ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনের সময় তিনি ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অনেকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে দ্রুত ও আরও ব্যাপক অভিযান চালানোর দাবি জানান।
এই দুর্যোগে চীন ও নেপালের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গিরং স্থলবন্দরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত এই স্থলবন্দরটি দুই দেশের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র।
বুধবারের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে স্থলবন্দরটির বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে নেপাল ও চীনের মধ্যে স্বাভাবিক সীমান্ত চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
গিরং স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ পরিচালিত হয়। তাই এই দুর্যোগের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি ও সীমান্ত বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু নেপাল নয়, চীনের তিব্বত অংশেও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অংশে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বতের দুর্গম পার্বত্য এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বা দুর্গম এলাকায় কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে।
দুর্যোগের পর চীন সরকারও দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করেছে। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত দল ও সরঞ্জাম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। তিনি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য নেন।
এর আগে বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ভূমিধসের কারণে অনেক সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণবাহী যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া নদীতে ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হতে পারে। ফলে নতুন করে আকস্মিক বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ থাকার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিখোঁজ নাগরিকদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানা গেছে।
হিমবাহ ধস, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের এই ঘটনা হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া এবং হিমবাহ হ্রদের পানি বৃদ্ধির মতো ঘটনা ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
বর্তমানে নেপাল ও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মূল অগ্রাধিকার হলো নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের উদ্ধার, মৃতদের শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা।
নিখোঁজ প্রায় এক হাজার মানুষের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকাজ যত এগোবে, নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে নদীতে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ এবং নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় পুরো পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।