ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

নেপালে আকস্মিক বন্যা: এক শিক্ষকের সিদ্ধান্তে বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:২৮, ৩১ আগস্ট ২০২৬

নেপালে আকস্মিক বন্যা: এক শিক্ষকের সিদ্ধান্তে বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থী

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের নুয়াকোটে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতা যেন কয়েক মিনিটের মধ্যেই বদলে দিয়েছিল একটি জনপদের চিত্র। ত্রিশূলী নদীর পানি হঠাৎ ফুলে উঠে আশপাশের এলাকা প্লাবিত করার সময় প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো নিরাপদ স্থানে ছুটছিলেন। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ছিল নদীর কাছাকাছি থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যেই বিদ্যালয় থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা কয়েকশ শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এখন সামনে আসছে।

গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ও ভূমিধসের পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। উজান থেকে নেমে আসা বিপুল পানি ত্রিশূলী নদী দিয়ে দ্রুতগতিতে নিচের দিকে ছুটে আসে। নদীর তীরবর্তী নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে এর প্রভাব পড়ে ভয়াবহভাবে। মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন স্থাপনা ও রাস্তা পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে।

ত্রিশূলী নদীর কাছেই অবস্থিত ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বন্যার খবর পাওয়ার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। শিক্ষার্থীদের নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে যাওয়ার সময়ও অনেকেই বুঝতে পারেননি, তাদের পেছনে কত বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইউনিশা বিবিসিকে জানায়, বন্যার পানি আসার অল্প সময় আগেই সে ও তার বন্ধুরা স্কুল এলাকা থেকে বের হতে সক্ষম হয়। বিদ্যালয়ের পেছনের সরু ও কাদাময় পথ ধরে তারা দ্রুত উঁচু জায়গার দিকে ছুটছিল। সেই সময় পেছনে তাকিয়ে ত্রিশূলী বাজারের ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পায় সে।

ইউনিশার বর্ণনায়, চোখের সামনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। স্বাভাবিক একটি সকাল মুহূর্তেই পরিণত হয় আতঙ্কের সময়ে।

এদিকে মেয়ের নিরাপত্তার খবর না পেয়ে বাড়িতে বসে উদ্বেগে সময় কাটাচ্ছিলেন ইউনিশার মা সাবিনা। বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি বারবার মেয়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে মেয়ের বাবার সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা চালান। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় তার উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।

পরে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হলেও ইউনিশা তখনও বাড়িতে ফিরতে পারেনি। বন্যার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় পরিবারের সঙ্গে দেখা করতেও সময় লাগে। শেষ পর্যন্ত ঘটনার তিন দিন পর বাড়িতে ফেরে সে।

মেয়েকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাবিনা। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর সন্তানকে সামনে পেয়ে তার চোখে পানি চলে আসে। তবে সেটি ছিল স্বস্তি ও আনন্দের কান্না।

আগাম সতর্কতা বদলে দিল পরিস্থিতি

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি সতর্কবার্তা পান। এর মধ্যে উজানের বেত্রাবতী এলাকায় পানি ঢুকে পড়া এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবরও ছিল।

সতর্কবার্তাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৬০০। দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় নদীর কাছাকাছি একটি আবাসিক ভবনও পানির নিচে চলে যেতে দেখেন তিনি। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও কিছুটা সময় চলে গেলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

এই ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, পাহাড়ি ও নদীঘেঁষা এলাকায় আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের সতর্কতা ও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্কুলের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে আগাম সতর্কবার্তার ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বন্যায় বিপর্যস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

নুয়াকোটের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এবারের বন্যায় নেপালের একাধিক জেলার শিক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার অন্তত ২০টি স্কুল বন্যার কবলে পড়েছে।

এর মধ্যে রাসুয়া জেলায় পাঁচটি, নুয়াকোটে সাতটি এবং ধাদিংয়ে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্কুলের অনেক শ্রেণিকক্ষে পানি, কাদা, বালি ও পলিমাটি ঢুকে পড়েছে। ফলে অনেক জায়গায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশেষ করে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। নদীর কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বরাবরই বেশি। এবারের দুর্যোগ সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

নুয়াকোটের ত্রিভুবন মাল্টিপল ক্যাম্পাস এবং ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেলও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যালয়ের মাঠের ওপর দিয়েই নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

হেলিকপ্টারে উদ্ধার ৪০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

বন্যার পর ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সেখানে আটকা পড়েন। পরে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তাদের উদ্ধার করে বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, বন্যার পর স্কুলের মাঠের মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে দ্রুত ক্লাস শুরু করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা পেলেও তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন আপাতত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলো পুনরায় চালু করা। শ্রেণিকক্ষ থেকে কাদা ও পলিমাটি সরানো, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে সময় লাগবে।

নুয়াকোটের এই বন্যা শুধু একটি বাজার বা কয়েকটি ভবন ধ্বংসের ঘটনা নয়; এর প্রভাব পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থায়ও। তবে ভয়াবহ সেই দুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারা স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে।

ইউনিশার মতো শিক্ষার্থীদের কাছে সেই সকাল হয়তো সারাজীবন মনে থাকবে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পরিচিত বাজারটি পানিতে হারিয়ে যেতে দেখা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং তিন দিন পর নিরাপদে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে।

নেপালের এই ঘটনা একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও দিয়ে যাচ্ছে নদী ও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য দুর্যোগের আগাম সংকেত, দ্রুত যোগাযোগ এবং তাৎক্ষণিক নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা কতটা জরুরি। বিশেষ করে স্কুল ও অন্যান্য জনবহুল স্থাপনায় কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা থাকলে আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন