ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

নেপালে বন্যা-ভূমিধস: নিহত বেড়ে ৬৭৫, নিখোঁজ ২৪০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮:৩৭, ৩০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৪২, ৩০ আগস্ট ২০২৬

নেপালে বন্যা-ভূমিধস: নিহত বেড়ে ৬৭৫, নিখোঁজ ২৪০০

ছবি: সংগৃহীত

নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের পঞ্চম দিনেও নিখোঁজদের উদ্ধারে জোরালো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

আজ রোববার (৩০ আগস্ট) নেপালের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থার সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে অনেক এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৬৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের উদ্ধারে ১৮ হাজার ৭০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধারের খবর আসছে।

কীভাবে শুরু ভয়াবহ এই দুর্যোগ

গত বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিকভাবে পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে নদী ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে পড়ার কারণেই এই ভয়াবহ পানির স্রোতের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্যোগের প্রকৃত কারণ জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হঠাৎ বন্যার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো সুযোগ পাননি। অনেক মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় কিংবা নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় পানির স্রোতে আটকা পড়েন। কয়েকটি এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে বাড়িঘর, দোকানপাট ও সড়ক পানির নিচে চলে যায়।

যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত

বন্যার পানির স্রোতে বেশ কয়েকটি সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সেতু ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে, আবার কোথাও সড়কের বড় অংশ ধসে গেছে। এতে উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে আটকে থাকা মানুষের কাছে খাদ্য, পানি ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

বিদেশি নাগরিকদের নিয়েও উদ্বেগ

এই দুর্যোগে নেপালে অবস্থানরত বিদেশি পর্যটক ও নাগরিকদের নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও ৩২০ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

উদ্ধার হওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভারতের ১৬৭ জন, চীনের ৪০ জন, ইউক্রেনের ৮ জন, জার্মানির ৪ জন, মাল্টার ৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ জন, ইতালির ২ জন, রাশিয়ার ২ জন, স্পেনের ২ জন, সুইজারল্যান্ডের ২ জন এবং তুরস্কের ২ জন রয়েছেন।

এ ছাড়া বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ওমান ও পর্তুগালের একজন করে নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। আরও ২১ জনকে অন্যান্য দেশের নাগরিক হিসেবে অথবা পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে পর্যটক ছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ব্যক্তিরা থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে তাদের সন্ধানে আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তিব্বতেও ব্যাপক প্রাণহানি

নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ভয়াবহ এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে আরও ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক পানির স্রোতে বিভিন্ন স্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল ও তিব্বতের দুই পাশেই দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিব্বতে হতাহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মরত ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা কর্তৃপক্ষও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

১৮ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মাঠে

নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষদের উদ্ধারে নেপালজুড়ে ১৮ হাজার ৭০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মাঠে রয়েছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সদস্যরা একযোগে কাজ করছেন।

উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করছেন। কোথাও মাটি ও কাদার নিচে, আবার কোথাও নদীর তীরে ও ভেসে আসা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মরদেহের সন্ধান মিলছে।

তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়ার আশঙ্কা এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত থাকায় অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা মাথায় রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

পরিবারগুলোর অপেক্ষা

দুর্যোগের পাঁচ দিন পরও যেসব পরিবারের স্বজন নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের উৎকণ্ঠা কাটেনি। হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে স্বজনদের খোঁজে ছুটছেন পরিবারের সদস্যরা।

অনেকেই মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। ফলে নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করে বিভিন্ন উদ্ধারকেন্দ্র ও হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করার কাজও চলছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন

প্রাথমিক উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর দুর্গত মানুষের পুনর্বাসনই হবে নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যেসব এলাকায় বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়েছে, সেখানে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে হিমবাহ ও পাহাড়ি জলাধারগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই ভয়াবহ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে কয়েক শ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ততই স্পষ্ট হবে। আপাতত নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।

তথ্যসূত্র: বিবিসি
 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন