ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২ আশ্বিন ১৪৩৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৬২৬, নিখোঁজ ১৯২৪

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১১:২৩, ২৯ আগস্ট ২০২৬

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৬২৬, নিখোঁজ ১৯২৪

ছবি: সংগৃহীত

হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। একই দুর্যোগের প্রভাবে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো অন্তত ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তবে দুর্যোগ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হওয়ায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

তিব্বতে ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ভিডিওতে উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের কাদা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাতে দেখা যায়। এ সময় তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছেন কি না, তা জানতে ‘কেউ আছেন?’ বলে ডাকছিলেন।

চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে সাতজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে সেখানে ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে চীন।

স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেলে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে এবং প্রবল স্রোতের নদী অতিক্রম করে উদ্ধারকারী দল তিব্বতের দুর্যোগের অন্যতম কেন্দ্রস্থল গিরং বন্দরে পৌঁছায়।

লাসার একটি অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দলের প্রধান জৌ মিংছি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে বলেন, সেখানে ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। পুরোনো সীমান্ত গেটের আশপাশের এলাকা ঘন কাদায় ঢেকে গেছে এবং সেখানে পা ফেললেই মাটিতে দেবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পুরোপুরি ধ্বংস গিরং বন্দর

নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ ছিল গিরং বন্দর। দুর্যোগের পর বন্দরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, বন্দরটির বড় একটি অংশ কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।

গিরং বন্দরের আশপাশে উদ্ধার তৎপরতার দায়িত্বে থাকা কমান্ড টিম পাহাড়ের ঢালগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ধসপ্রবণ এলাকায় কাজ করা উদ্ধারকারীদের আগাম সতর্ক করার চেষ্টা চলছে।

আবহাওয়ার অনুকূল স্বল্প সময়কে কাজে লাগিয়ে নিখোঁজদের মধ্যে কেউ জীবিত আছেন কি না, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পুনরায় চালুর কাজও চলছে।

তবে ধসের পর তৈরি হওয়া হ্রদের পানির উচ্চতা আবারও বাড়ছে বলে জানিয়েছে চীনা গণমাধ্যম। এতে নতুন করে কাদা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।

খাদ্য-পানির সংকটে হাজারো পরিবার

দুর্যোগে নেপালের কয়েক হাজার পরিবার খাদ্য ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ নেপালে ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, নেপালের জন্য ইউরোপ তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ ইউরো দিচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই অর্থ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সম্প্রদায়গুলোর জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যবহার করা হবে বলে জানান তিনি।

নেপালের পাশে চীন

এদিকে নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেলের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

এক বার্তায় তিনি বলেন, দুই দেশের জনগণ এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে যত দ্রুত সম্ভব একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করবেন এবং নিজেদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করবেন—এ বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে একদিকে যখন নেপালে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে তিব্বতেও নতুন করে বৃষ্টি ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে প্রাণহানি ঠেকানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন