এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:৪৮, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ৪৮ বছরে পা দিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-কে রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে রেখে দলটি রাষ্ট্র পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংঘাত ও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলেছে।
প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই বড় ধরনের সাফল্য পায় বিএনপি। এরপর ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন, ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জনের মতো নানা বাঁক পেরিয়ে দলটি ২০২৬ সালে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে।
যে প্রেক্ষাপটে জন্ম বিএনপির
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল তীব্র অস্থিরতার মধ্যে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় একের পর এক পরিবর্তন ঘটে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই সময় জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন মত ও পেশার মানুষকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন। বিএনপির আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল-জাগদল গঠিত হয়েছিল। পরে সেটিকে বিলুপ্ত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মানুষকে নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। ঢাকার রমনা এলাকায় দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসেও ওই দিনটিকেই প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান দলটির চেয়ারম্যান হন। এ কাতারে ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতা ও সংগঠক। দলের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রাখা হয় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। পাশাপাশি উন্নয়ন, উৎপাদন, স্বনির্ভরতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দলটির রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম ভিত্তি ছিল ১৯ দফা। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতা ও জনগণের জীবনমান উন্নয়ন।
প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসেই নির্বাচনী সাফল্য
বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা আসে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পায় এবং সরকার গঠন করে।
মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের এমন নির্বাচনী সাফল্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থানকে দ্রুত শক্তিশালী করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সরকার উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী কর্মসূচির ওপর জোর দেয়।
তবে বিএনপির এই উত্থানের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিশাসিত কাঠামো, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিয়ে বিতর্কও ছিল। ফলে দলটির জন্ম ও বিকাশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বৃহত্তর পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ও বিএনপির নতুন অধ্যায়
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টার সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন। প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন বছরের মাথায় প্রতিষ্ঠাতা ও দলীয় প্রধানকে হারিয়ে বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকে। কিন্তু ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সময় দলের নেতৃত্বে সামনে আসেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথমদিকে রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক মুখে পরিণত হন। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব বিএনপিকে নতুন সাংগঠনিক শক্তি দেয়।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের আন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন। এর পরের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
১৯৯১: সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়।
এই সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা আবার সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যায়। বিএনপি সরকারের সময়ে শিক্ষা, অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হয়। তবে একই সঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাতও বাড়তে থাকে।
১৯৯৬: দুই নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল
১৯৯৬ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিএনপি ওই নির্বাচনে সরকার গঠন করলেও রাজনৈতিক চাপ ও আন্দোলনের মুখে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
পরবর্তীতে জুনে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং বিএনপি বিরোধী দলে যায়। বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে সংসদে বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে অবস্থান নেয়।
এই সময় থেকেই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও দৃঢ় হয়। পরবর্তী কয়েক দশক দেশের রাজনীতি মূলত এই দুই দলের প্রতিযোগিতা ও সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
২০০১: আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় জয় পায়। খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করেন।
বিএনপি সরকারের এই মেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। দলীয় সমর্থকদের কাছে এই সময়টি বিএনপির উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
তবে এই সময়েও রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দল ও সরকারের সম্পর্ক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
১/১১ ও দীর্ঘ সংকট
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয় এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও গ্রেপ্তার শুরু হয়।
খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানও কারাবন্দি হন। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে যান এবং দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। বিএনপি বিরোধী দলে চলে যায়।
২০১৪: নির্বাচন বর্জন
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি ও তার জোটের অধিকাংশ দল বর্জন করে।
এর ফলে বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়। দলটি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। রাজনৈতিক সংঘাত, অবরোধ, হরতাল ও সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়।
২০১৮: খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব
২০১৮ সাল বিএনপির জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া কারাদণ্ড পাওয়ার পর তাকে কারাগারে যেতে হয়। এরপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দল পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
লন্ডনে অবস্থান করেও তারেক রহমান ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বিএনপি তাকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে অংশ নেয়। নির্বাচনে দলটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি এবং সংসদে সীমিত সংখ্যক আসন পায়।
এরপরও বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতি ও সরকারবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
২০২৪: নির্বাচন বর্জন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। দলটির দাবি ছিল নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়।
এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে ভারতে চলে যান। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। দলটির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পান।
খালেদা জিয়ার মুক্তি ও শেষ অধ্যায়
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়া কারামুক্ত হন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আর আগের মতো ফিরতে পারেননি।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান খালেদা জিয়া। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
তার মৃত্যু বিএনপির রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান ঘটায়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে দলকে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠিত করেছিলেন, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের হাতে চলে আসে।
খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি হয়। রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার কাছে অনুষ্ঠিত জানাজায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ অংশ নেন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
দেশে ফেরার পর তিনি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রচারে তার নেতৃত্ব ছিল কেন্দ্রীয়।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বের ভারও আরও স্পষ্টভাবে তারেক রহমানের ওপর এসে পড়ে।
২০২৬: দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তনের একটি অধ্যায় তৈরি করে।
নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পায় বলে নির্বাচনী ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণেও বিএনপির এই বিজয়কে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিএনপির জন্য ২০২৬ সাল আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টে দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদীয় ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এর ফলে দলটির নেতৃত্বাধীন সরকারে রাষ্ট্র ও সরকার—দুই পর্যায়েই বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তৈরি হয়েছে।
৪৮ বছরে বিএনপি: সাফল্য, সংকট ও বিতর্ক
প্রতিষ্ঠার পর ৪৮ বছরে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় একাধিকবার আসার সাফল্য, তেমনি রয়েছে পরাজয়, আন্দোলন, কারাবরণ, নির্বাচন বর্জন ও রাজনৈতিক সংঘাত।
দলটির সমর্থকদের কাছে বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্যে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে দলের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বিএনপির বিভিন্ন সময়ের সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক সহিংসতা, জোট রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির ভূমিকা একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তা বিতর্কমুক্ত নয়।
সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে বিএনপি এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকার পর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দলটির জন্য বড় পরীক্ষা।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অর্থনীতি পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা—এসব বিষয় নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, সেটিই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনার মাটিতে যে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বিএনপি আজ ৪৮ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ৪৯তম বছরে প্রবেশ করেছে। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার দীর্ঘ নেতৃত্ব, তারেক রহমানের দুই দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী বিজয়—সব মিলিয়ে বিএনপির ইতিহাস বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।
সময় বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক পরও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিএনপির অবস্থান অটুট। এখন সেই দলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—ক্ষমতায় ফিরে নিজেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা।