এইচভি নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩:১৯, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিদিশার জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগে নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ায় তাঁর আইনজীবীরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
আদালতে বিদিশার পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান খান ও অ্যাডভোকেট মাসুদ মিয়া। শুনানি শেষে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। পরে আইনজীবী মাসুদ মিয়া জানান, বিদিশার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকায় জামিন পাওয়ার পর তাঁর কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর
হাইকোর্টে জামিন পাওয়ার আগে বিদিশা সিদ্দিক নিম্ন আদালতে জামিন চেয়েছিলেন। গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। ওই আদেশের পর তাঁর আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন।
এরপর রোববার হাইকোর্টে আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত বিদিশাকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এখন প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন বিদিশা।
যে মামলায় কারাদণ্ড
বিদিশার বিরুদ্ধে করা মামলাটি মূলত রাজধানীর বারিধারার একটি ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে। মামলার বাদী ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন ২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বারিধারার একটি ফ্ল্যাট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে বিদিশার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন ছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ২০ মে মামলাটির রায় ঘোষণা করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলম।
রায়ে বিদিশাকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁকে আরও এক মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
তবে রায় ঘোষণার সময় বিদিশা আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়।
রায়ের পর গ্রেপ্তার
আদালতের সাজা পরোয়ানা জারির পর বেশ কিছুদিন বিদিশা গ্রেপ্তার হননি। পরে গত ২৫ আগস্ট রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৮টার দিকে রেস্তোরাঁ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে বিদিশার পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর থেকেই তাঁর জামিন নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন করা হয়। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করলে তাঁর আইনজীবীরা হাইকোর্টে যান।
হাইকোর্টে স্বস্তি
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর রোববার হাইকোর্টে জামিন পাওয়ায় বিদিশার জন্য এটি বড় ধরনের আইনি স্বস্তি হিসেবে দেখছেন তাঁর আইনজীবীরা।
হাইকোর্টের আদেশের পর অ্যাডভোকেট মাসুদ মিয়া বলেন, বিদিশার বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা না থাকায় জামিন পাওয়ার পর তাঁর কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।
অর্থাৎ, হাইকোর্টের জামিন আদেশের পর কারাগার থেকে তাঁর মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই তিনি মুক্তি পাবেন।
এরশাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও আলোচনায় বিদিশা
বিদিশা সিদ্দিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত একটি নাম। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে।
এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে তিনি দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেন। তাঁর ব্যক্তিজীবনও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সেই সূত্রেই বিদিশার নামও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে পরিচিতি পায়।
এরশাদ ও বিদিশার সম্পর্ক, বিয়ে, পারিবারিক জীবন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিচ্ছেদ—সবকিছুই একসময় ব্যাপকভাবে আলোচিত ছিল।
আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন বিদিশা
এরশাদের সঙ্গে সম্পর্কের সময় ও পরবর্তী সময়েও বিদিশা বিভিন্ন কারণে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় ছিলেন। কখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, কখনো ব্যক্তিগত জীবন, আবার কখনো আইনি জটিলতার কারণে তাঁর নাম সংবাদে এসেছে।
বিশেষ করে এরশাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। যদিও বর্তমান মামলাটি রাজনৈতিক কোনো বিষয় নয়; এটি একটি ফ্ল্যাট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলা।
মামলাটি ২০০৮ সালে করা হলেও এর বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। অবশেষে চলতি বছরের মে মাসে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করেন।
২০০৮ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ আইনি অধ্যায়
বিদিশার বিরুদ্ধে করা মামলার সময় থেকে রায় এবং পরবর্তী গ্রেপ্তার পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছরের একটি দীর্ঘ আইনি অধ্যায় তৈরি হয়েছে।
২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন মামলা করেন। এরপর মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলে দীর্ঘ সময়। ২০২৬ সালের ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়। প্রায় তিন মাস পর ২৫ আগস্ট রাতে গুলশানের একটি রেস্তোরাঁ থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন আদালতে হাজির করার পর জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ২ সেপ্টেম্বর মহানগর দায়রা জজ আদালতেও জামিন না মেলায় শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে আবেদন করেন তাঁর আইনজীবীরা।
রোববার সেই আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দেন।
এখন মুক্তির অপেক্ষা
হাইকোর্টের জামিন আদেশের পর বিদিশার সামনে এখন কারামুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করার পালা। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকায় মুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই।
দীর্ঘ ১৮ বছর আগে দায়ের হওয়া একটি মামলার রায়ে কারাদণ্ড, সাজা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে জামিন—সব মিলিয়ে বিদিশা সিদ্দিকের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও তাঁকে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
তবে মামলার মূল অভিযোগ ও আদালতের রায়ের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান নির্ধারণ করবে বিচারিক প্রক্রিয়া। হাইকোর্টের জামিনের ফলে আপাতত কারাগার থেকে বের হওয়ার পথ তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরই তিনি মুক্তি পাবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।